হালকা ধাক্কা বা পুরনো ব্যথা থেকেও মেরুদণ্ডে বড় সমস্যা (Spine Problem) হতে পারে। কখন অবহেলা বিপজ্জনক, কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন, আর আধুনিক চিকিৎসায় কতটা নিরাপদ অপারেশন—সব জানুন সহজ ভাষায়।

ডক্টর ইমতিয়াজ ঘানি, চেন্নাই অ্যাপোলো
শেষ আপডেট: 12 February 2026 12:55
সারাদিনের নানা ঝক্কি সামলাতে গিয়ে হঠাৎ করে চোট লেগে গেলেই বিপদ। সেটা যদি হাতে-পায়ে হয় তবু বোঝা যায়। কিন্তু যদি চোট নিভৃতে হয়! বিশেষ করে শিরদাঁড়ার আনাচ-কানাচে। আসলে চলতে-ফিরতে শিশু থেকে বয়স্ক সকলেরই এমন আচমকা ধাক্কা লেগে যেতে পারে। হয়তো সেই মুহূর্তে কিছুই বোঝা গেল না, পরে বিশাল ভোগান্তি।
কারও কারও শিরদাঁড়ায় ছোট আঘাত পরবর্তীকালে সার্জারির প্রয়োজনীয়তাও ডেকে আনে। আর মেরুদন্ডে ছুরি-কাঁচি শুনলেই যেন একটা আতঙ্ক, এই বুঝি স্বাভাবিক হাঁটা-চলা বন্ধ!
তাই শুরুতেই বলব, মেরুদণ্ডে আঘাত নিয়ে অবহেলা করবেন না। আশ্বাস আছে অপারেশনেরও। কিন্তু কোন চিকিৎসা ব্যাকবোনের জন্য নিরাপদ?
শিরদাঁড়ার সমস্যা কীসে বাড়ে?
প্রথমেই বলব, শিরদাঁড়ায় ব্যথা বা নানা অস্বস্তির পিছনে আমাদের জীবনযাপনই দায়ী। সারাদিন মোবাইল, ল্যাপটপে বসে কাজে, বসার ভঙ্গিমা ঠিক না থাকা, খাদ্যাভ্যাস ও সারাদিন ঘরে বসে থাকা, এক্সারসাইজ না করাই শিরদাঁড়ার জন্য বিপজ্জনক।
শিশু থেকে বয়স্ক সকলেই এখন ঘরে বসে সময় কাটান বেশি, তাই ভিটামিন ডি-এর অভাবও হাড়জনিত সমস্যা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে মেরুদণ্ড অল্পতেই বেশি আঘাত ডেকে আনছে। যার পরিণতি মারাত্মক। কারণ শিরদাঁড়া সমগ্র শরীরকে চালনা করে। এই হাড়ে বেশি দিন খারাপ চাপ পড়লে গোটা শরীরে ব্যথা শুরু হয়। পিঠ, কোমরে যন্ত্রণা, বেশিক্ষণ সোজা হয়ে বসে থাকলে অসুবিধা হতে পারে। এখন ২০-৩০ বছর বয়সিদের মধ্যেই এই ধরনের ব্যথার সমস্যা খুব বেড়েছে এই কারণেই।
প্রাথমিক লক্ষণ অবহেলা নয়
ব্যথা খুব তীব্র হলেই যে তা জটিল, এমনটা সবসময় নয়। অল্প ব্যথা হলেও তা চিন্তার কারণ হতে পারে। ঘাড়, কোমরে কিংবা হাতে-পিঠে ব্যথা ২-৩ সপ্তাহ বা তার বেশি থাকলে এবং ওষুধ খেয়েও যদি সেই ব্যথা না কমে, তবে বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। অনেকেই ফিজিওথেরাপি, ব্যায়াম করে ব্যথা থেকে নিস্তার পেতে চান। কিন্তু শিরদাঁড়ার সিরিয়াস সমস্যা এভাবে মেটে না। উল্টে চিকিৎসায় দেরি হয়ে যায়। তাই প্রথমেই চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে। সরাসরি স্পাইন সার্জেনের কাছে এলেই ভাল।
আরও সতর্ক হতে হবে যদি হাতে, কোমরে অসাড়তা দেখা যায়। হাড় কোলাপ্স হয়ে গিয়ে এমন হতে পারে।
আড়ালে জটিল কারণ
শিরদাঁড়ার একটি জটিল সমস্যা স্কোলিওসিস। এক্ষেত্রে শিশুদের মেরুদণ্ড স্বাভাবিকভাবে সোজা হয় না। এখন এক্ষেত্রেও চিকিৎসা হচ্ছে সহজে। তাই অন্যান্য শিরদাঁড়ায় সমস্যা হলেও ভয়ের কোনও কারণ নেই। বয়স বাড়লে (১৮-১৯ বছর বয়সে) হতে পারে অ্যাডোলেসেন্ট ইডিওপ্যাথিক স্কোলিওসিস পেইন।
স্কোলিওসিস মানেই সবসময় যে সার্জারি লাগবে তা নয়। হাড়ের বিকলাঙ্গতা কতটা রয়েছে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করা হয়। বছরে একাধিকবার পর্যবেক্ষণে রেখে তারপর চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করা হয়। অল্প বাঁকা হলে তা ওষুধ ও অন্যান্য পদ্ধতি দিয়েই চিকিৎসা করা সম্ভব হবে।
অনেকের আবার অস্টিওপোরোসিস থেকে হাড় দুর্বল হলে শিরদাঁড়া বেঁঁকে যেতে পারে। ইনফেকশন থেকেও সমস্যা হয়। টিউবারক্যুলোসিস হাড় খারাপ করে দেয়। এদেশে এই সংক্রমণ বেশি হয়, তাই আমরা অনেক রোগী পাই যাঁদের, শিরদাঁড়ার সমস্যার কারণ হিসেবে ধরা পড়ে টিবি। তখন বায়োপ্সি করে রোগ নির্ণয় করতে হয়।
আবার শিরদাঁড়ায় টিউমার হলে, সেই ব্যথা সারতে চায় না। তখন বায়োপ্সি করে তারপর সার্জারি করার প্রয়োজন পড়ে।
স্পন্ডিলোলিস্থেসিস হলে শিরদাঁড়ার একটি ডিস্ক অন্য ডিস্কের উপর উঠে যায়। হতে পারে স্লিপ ডিস্কও। ফলে ব্যথা হয়, পিঠে, কোমরে অসাড়তা হয়।
আধুনিক চিকিৎসায় ভয় নেই
বর্তমানে মেরুদণ্ডে রোবোটিক সার্জারিও হচ্ছে। ফলে জটিলতা অনেকটাই কমেছে আর দ্রুত অপারেশন করা যাচ্ছে। বেশি কাটাকাটির ঝামেলা নেই, ছোট ফুটো করেই শিরদাঁড়ার ত্রুটি ঠিক করে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
অনেকেই মনে করেন, একবার শিরদাঁড়ায় অপারেশন হলে জীবন প্রায় শেষ। আর হয়তো স্বাভাবিক হাঁটাচলা করা যাবে না। একদম ভুল ধারণা। এখন খুব সফলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে এই জটিল সার্জারি।
আরও একটা কথা বলি, অল্প ঘাড়ে-পিঠে ব্যথা মানেই সার্জারি করতে হবে তা নয়। শিরদাঁড়ার সমস্যা ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই ওষুধে ঠিক হয়ে যায়। শুরুতে চিকিৎসা শুরু করলে সমস্যা দ্রুত সেরে যায়।
কী কী মনে রাখবেন