ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর শরীরের প্রায় পুরো অন্ত্র নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বিরল অন্ত্র প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে কীভাবে নতুন জীবন ফিরে পেলেন এক মা, সেই মানবিক কাহিনি।

শেষ আপডেট: 23 January 2026 18:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক মুহূর্তেই বদলে গিয়েছিল লেসি কর্নেলিয়াস-বয়েডের জীবন। পরিবার নিয়ে আনন্দের রোড ট্রিপ থেকে তিনি পৌঁছে যান হাসপাতালের আইসিইউ-তে, শুরু হয় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। ভয়াবহ একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় ওকলাহোমার এই তরুণী মাকে একের পর এক ছ’টি জরুরি অস্ত্রোপচারের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু হাসপাতালে টানা ৩০ দিন কাটালেও, তাঁর লড়াই তখনও শেষ হয়নি।

ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, ওকলাহোমার ইউকনের বাসিন্দা ৪১ বছর বয়সি লেসির অন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দুর্ঘটনায়। সাধারণত একজন মানুষের শরীরে প্রায় ৩৫ ফুট অন্ত্র থাকে। কিন্তু একের পর এক অস্ত্রোপচারের পর লেসির শরীরে অবশিষ্ট ছিল মাত্র ৩৫ ইঞ্চি অন্ত্র।
এর ফলে অন্ত্রের একাধিক অংশে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোথাও ক্ষতি হয়েছিল, কোথাও আবার সম্পূর্ণভাবে কোষ নষ্ট হয়ে যায়। প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসকেরা সেই অংশগুলি বাদ দিতে বাধ্য হন। তার ফলেই লেসির শরীরে দেখা দেয় ‘শর্ট বাওয়েল সিনড্রোম’। এই অবস্থায় শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও তরল শোষণ করতে পারে না, কারণ ক্ষুদ্রান্ত্রের বড় অংশ অনুপস্থিত বা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, অন্ত্র আর ঠিকমতো বর্জ্য কোলনে পৌঁছে দিতে পারছিল না।
নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং শরীরকে পুষ্টি জোগাতে লেসিকে সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে হচ্ছিল ‘টোটাল প্যারেন্টারাল নিউট্রিশন’ বা টিপিএনের উপর, যা প্রতিদিন আইভির মাধ্যমে দেওয়া হত। পাশাপাশি, শরীরের বাইরে বর্জ্য বের করার জন্য ব্যবহার করতে হত অস্টোমি ব্যাগ।

লেসির কথায়, অস্টোমি ব্যাগ আর টিপিএন তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে আইভিতে পুষ্টি নেওয়া, আর বারবার ব্যাগ পরিষ্কার— এই সবের মধ্যে তিনি কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। ছ’বছরের মেয়েকে নিয়ে কোথাও বেরোনো তো দূরের কথা, স্বাভাবিক জীবনযাপনই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। চাকরিও ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাঁকে।
নতুন কোনও চিকিৎসার পথ খুঁজতে এক সার্জনের পরামর্শে লেসি ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিকে আসার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করেন, তাঁর অস্টোমির আউটপুট অত্যন্ত বেশি, যা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ডিহাইড্রেশন ও কিডনির ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

সেখানকার অন্ত্র প্রতিস্থাপন বিভাগের সার্জিকাল ডিরেক্টর ডক্টর মাসাতো ফুজিকি জানান, প্রথমে ওষুধ দিয়ে আউটপুট কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনও উন্নতি হয়নি। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি হয়ে পড়েছিল।
ডক্টর ফুজিকি আরও বলেন, টিপিএন সরাসরি পাচনতন্ত্রকে বাইপাস করে। অনেক ক্ষেত্রে এর ফলে যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমা ও প্রদাহ দেখা দিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত লিভার ড্যামেজের কারণ হয়। লেসির ক্ষেত্রেও সেই সমস্যাই দেখা দিয়েছিল। সবদিক বিবেচনা করে চিকিৎসক দল সিদ্ধান্ত নেয়, অন্ত্র প্রতিস্থাপনই তাঁর অঙ্গগুলি রক্ষা করার এবং জীবনযাত্রার মান ফেরানোর সবচেয়ে ভাল উপায়।

অন্ত্র প্রতিস্থাপন পৃথিবীর বিরলতম প্রতিস্থাপনগুলির মধ্যে একটি। ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিক সেই হাতে গোনা কয়েকটি কেন্দ্রের অন্যতম, যেখানে এই চিকিৎসা করা হয়। ডক্টর ফুজিকির কথায়, ২০২৪ সালে আমেরিকায় যেখানে ২৭ হাজারের বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন এবং ১১ হাজারেরও বেশি লিভার প্রতিস্থাপন হয়েছে, সেখানে অন্ত্র প্রতিস্থাপন হয়েছে মাত্র ৯৭টি। কারণ এই চিকিৎসা পদ্ধতি এখনও বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে।
ট্রান্সপ্লান্টের তালিকায় নাম ওঠার পর লেসি ফিরে যান ওকলাহোমায়। কিন্তু সব সময় ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে হত, যে কোনও মুহূর্তে ডাক আসতে পারে এই আশায়। অবশেষে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত ফোন কল।
প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি লেসি। তবে অস্ত্রোপচারের সময় এসে গিয়েছে জানতে পেরে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাসও ফেলেছিলেন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আইভি নিউট্রিশন আর অস্টোমি ব্যাগের সঙ্গে লড়াই চলছিল তাঁর।

কল পাওয়ার পর সবকিছুই দ্রুত ঘটে। সেদিনই বিমানে করে তিনি পৌঁছে যান ওহাইওর ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মূল ক্যাম্পাসে। একই দিনে অস্ত্রোপচার হয়। সফল প্রতিস্থাপনের পর হাসপাতালে সুস্থ হয়ে ওঠার পর কয়েক মাস থাকতে হয় ফলো-আপ চিকিৎসার জন্য।
শেষমেশ অস্ত্রোপচারের সাফল্যে লেসির পাচনতন্ত্র আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে শুরু করে। আর তাঁকে দীর্ঘ সময় আইভিতে খাবার খেতে হয় না, অস্টোমি ব্যাগও প্রয়োজন নেই।
লেসির কথায়, এখন তিনি শরীরের মধ্যেই পুষ্টি শোষণ করতে পারছেন। আর প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা আইভির সঙ্গে বাঁধা থাকতে হয় না। ২৪ ঘণ্টা শরীরের সঙ্গে অস্টোমি ব্যাগ লাগিয়ে রাখার দুশ্চিন্তাও নেই।

তবে নিয়মিত চিকিৎসকদের সঙ্গে ফলো-আপ চলবে, যাতে প্রতিস্থাপিত অঙ্গ ঠিকভাবে কাজ করছে কি না এবং কোনও প্রত্যাখ্যানের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে কি না, তা নজরে রাখা যায়। ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী লেসি এখন আবার মেয়ের সঙ্গে খেলাধুলা, স্বামীর সঙ্গে বাইরে সময় কাটানো— স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন।
এই অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়ে লেসি ও ডক্টর ফুজিকি চান, আরও মানুষ জানুন, এই বিরল কিন্তু জীবনদায়ী চিকিৎসার কথা। দুর্ঘটনার পর একসময় তাঁকে বলা হয়েছিল, এটাই তাঁর জীবন, আর কিছু করার নেই। কিন্তু বাস্তবে ছিল আরেকটি পথ, যা তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
ডক্টর ফুজিকির কথায়, অন্ত্র প্রতিস্থাপন অনেক রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে, কিন্তু বহু মানুষই জানেন না যে, এমন একটি বিকল্প রয়েছে। সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই চিকিৎসার ফলাফল দিন দিন আরও ভাল হচ্ছে।
সবশেষে লেসি কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর অঙ্গদাতার পরিবারকে। তাঁর কথায়, এই প্রতিস্থাপন শুধু তাঁর স্বাস্থ্য ফেরায়নি, পরিবার নিয়ে বাঁচার আনন্দও ফিরিয়ে দিয়েছে।