বাড়ির যে কোনও পোষ্য ঠিক ছোট শিশুর মতোই। তারাও নিজের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতে পারে না। বুঝে নিতে হয় তাদের কী কষ্ট হচ্ছে। যাঁর পোষ্য, তিনি যে সেটি সব ক্ষেত্রেই বুঝতে পারেন, এমন নয়। কিন্তু আমরা চিকিৎসকরা এই পোষ্যর সমস্ত ভাষা বুঝি। ওরা আমাদের কাছে বেবি, বলা ভাল শিশু। এই বোঝাটাই পশুচিকিৎসক হিসেবে সবচেয়ে জরুরি কাজ।

পশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অবার্ণ মাহাতো
শেষ আপডেট: 17 February 2026 11:51
বাড়ির যে কোনও পোষ্য ঠিক ছোট শিশুর মতোই। তারাও নিজের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতে পারে না। বুঝে নিতে হয় তাদের কী কষ্ট হচ্ছে। যাঁর পোষ্য, তিনি যে সেটি সব ক্ষেত্রেই বুঝতে পারেন, এমন নয়। কিন্তু আমরা চিকিৎসকরা এই পোষ্যর সমস্ত ভাষা বুঝি। ওরা আমাদের কাছে বেবি, বলা ভাল শিশু। এই বোঝাটাই পশুচিকিৎসক হিসেবে সবচেয়ে জরুরি কাজ।
এর পাশাপাশি কুকুর হোক বা বেড়াল, এদেরও কিছু হলে চোখ, জিভের রং সবই দেখে বোঝা দরকার কিছু সমস্যা হচ্ছে কিনা। মুখের গন্ধ শুঁকে বুঝতে হয়, সমস্যা কী হচ্ছে। এতে অনেকটাই অনুমান করা হয়ে যায় যে কী কী অসুখ হয়েছে। তারপর প্রয়োজনে কিছু টেস্টও করাতে হয়।
যে কোনও পোষ্যের একটা ভাষা আছে। সেটা আমাদের বুঝতে হয়। কেউ লেজ নেড়ে, কেউ গা ঘেষে, কেউ আবার শুধু তাকিয়ে থেকেই মনের ভাব ব্যক্ত করতে চেষ্ট করে। ওদের ভাষা বোঝাটা খুব দরকার। আমার ডাক্তারবাবুরা সেটাই বুঝি সহজে। আমার হলাম পেট পেরেন্ট।
আমার নিজেরই চারটি জাতের কুকুর তথা সন্তান রয়েছে। ল্যাব্রাডর,সাইবেরিয়ান হাস্কি,শিহ তজু ও কোকরফেনি রয়েছে। এই চারটির মধ্যে কোকরফেনি হলো একমাত্র ছেলে বাকি সব কুকুরই মেয়ে। সারাদিন একভাই, তিন বোন মিলে লড়াই করে যাচ্ছে। খেলা, খুনসুটি করেই দিন কাটায়।
অনেকেই হুজুগে পোষ্য নিয়ে ফেলেন। অত কিছু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেন না। তাঁদের ক্ষেত্রে কিন্তু পরবর্তীকালে সমস্যা হতে পারে। তাই প্রথমে পোষ্য নেওয়ার আগে নানা দিক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্তমানে পোষ্যের সংখ্যা খুব বেড়েছে। ছোট ছোট বিষয়গুলো সকলের জন্য জানা দরকার। এখন স্কুলে সেক্স এডুকেশনের মতোই জরুরি অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ারও খুব জরুরি একটি বিষয়। অর্থাৎ প্রত্যেকের জানা দরকার, একটা কুকুর মানে তার দিকে পাথর ছোড়া যায় না। একটা কুকুরেরও মন খারাপ হয়, শরীরে কষ্ট হয়, ওরাও আদর পেলে পোষ মানায়
পেট পেরেন্টিং কী?
আরও একটা জরুরি বিষয় হলে, কোন জাতের পেট বা কুকুর নিচ্ছেন সেটা জেনে তাকে বাড়িতে আনার আগে তার ব্যাপারে গুগল করে পড়ে নিতে হবে। জেনে নিতে হবে সে কী ধরনের পরিবেশে থাকলে পছ্ন্দ করে, তার জন্য আলাদা কিছু ব্যবস্থা করতে হবে কিনা। এগুলো জেনে সেই মতো ব্যবস্থা করে পোষ্যকে বাড়িতে আনতে হবে। এটা হল পেট পেরেন্টিং।
পেট ওনারশিপও খুব জরুরি। যে জাতের কুকুর আনছেন সেই মতো তাকে পরিচর্যা দরকার। না হলে এদের খুবই সমস্যা হয়। কারও লোম পড়ে যায়, কারও মেঝেতে থাকতে সমস্যা হয়, কেউ ঠিক মতো খাবার না পেলে খুশি থাকে না। এগুলো ওদের খুবই অস্বস্তির বিষয়। তাই পেট পেরেন্ট হতে গেলে অনেক কিছু বুঝতে হবে। স্নেহ যেমন থাকতে হবে তেমনই পেট বাড়িতে নিয়ে আসার আগে কিছু টেকনিক্যাল বিষয়ে জ্ঞান থাকা খুব দরকার।
পেট চিকিৎসা খরচের
অবহেলা করলে এদের সমস্যা জটিল হয়, আর এদের চিকিৎসা খরচসাপেক্ষ। কারণ পেট মেডিসিনের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আসে তাই কিছু হলে ট্রিটমেন্ট করতে গেলে খরচ বাড়ে। তাই প্রথম থেকেই বেশি যত্নশীল হতে হবে।
পোষ্যরও মনখারাপ হয়
কুকুর সহজে পোষ মেনে নেয়, তাই একটু কষ্ট পেলেই ওদের মনে চাপ পড়ে খুব। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, রোজ খাবার খেতে দিলেই যে কুকুর পোষ মানে, তা নয়। এর চেয়ে বেশি পছন্দ করে, প্রভুর আদর, যত্ন, কেউ এসে তাকে জড়িয়ে ধরছে, যত্ন করে তাকে এগুলো একটি কুকুরকে মানসিকভাবেও তৃপ্তি দেয়। প্রতিটি জাতের কুকুরের আলাদা আলাদ চাহিদা আছে। প্রথমে সেগুলো জেনেই তারপর ঘরে নিয়ে আসুন পোষ্যটিকে। যে জাতের কুকুর দৌড়ঝাঁপ করতে পছন্দ করে, বাইরে খেলতে পছন্দ করে তাদের যদি ফ্ল্যাটে আটকে রাখা হয় তাহলে তো তার কষ্ট হবেই। এদের সময়ে খেলতে নিয়ে যাওয়া, শরীরচর্চা করা খুব দরকার। নাহলে সেই কুকুর ডিপ্রেশনে চলে যায়।
পেট ক্লিনিকে কী পথকুকুরদের (Stray dog) চিকিৎসা হয়?
হ্যাঁ হয়। তবে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। রাস্তাঘাটে সারমেয়দের অবহেলা দেখলে তাদের ক্লিনিকে এনে চিকিৎসা করানোর মানসিকতা থাকতে হবে পথচারীদের। এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম, যাঁরা রাস্তার সারমেয়কে দেখে এইভাবে সচেতন হয়ে ডাক্তারখানায় আনবে। তবে এদের চিকিৎসার জন্যও সঠিক প্রটোকল থাকা দরকার। কারণ সমাজে কুকুর-বেড়ালের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও আমাদের সুস্থ থাকা জরুরি। এটা মাথার রেখেই এদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে।
না-মানুষদের কষ্টেও চোখ ভেজে
কিছুদিন আগে একটি কুকুরকে নিয়ে আসে চিকিৎসা করাতে, সেই গোল্ডেন রিট্রিভারের কিছু অ্যানাটমিক্যাল সমস্যা ছিল। যেমন হেপাটিক পোর্টাল শিরা ছোট ছিল, লিভার থেকে হার্টে রক্ত যেতে অসুবিধা হতো। একে চিকিৎসা করা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা। ইনজেকশন ও অন্যান্য চিকিৎসা করতে গেলে কুকুরটা ভয় পায় এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এ কুকুর একেবারে ভয় তো পায়ই না, উল্টে আমার কাছে আসবে দরজার কাছে উঁকি মারে, কখন তাকে ডাকব। এটা ভালবাসা দিয়েই পাওয়া যায়। কুকুরটাও বোঝে যে এটা ওর সেফ প্লেস। এমন অনেক জটিল রোগ নিয়ে কুকুর আগে তার প্রভুদের সঙ্গে। কুকুরের ক্যানসারও সারিয়ে তুলেছি, এমন ঘটনাও আছে। এমন মানুষও দেখেছি, তার কুকুরের চিকিৎসার জন্য বয়স্ক মানুষটি পুরো সেভিংসের টাকা তুলে নিয়েছেন। এরাই হয়তো সত্যিকারের পেট পেরেন্টিং। পেট ওনার না হলে পেরেন্ট হয়ে উঠুন।