বনগাঁয় মনিপাল হাসপাতাল হোয়াইটফিল্ড ও ভার্থুর রোডের আউটরিচ OPD চালু। হৃদরোগ, গ্যাস্ট্রিক, অর্থোপেডিক ও স্পাইন সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের স্বাস্থ্য সেমিনার।

বনগাঁয় লঞ্চ হল মনিপাল ওপিডি সার্ভিস।
শেষ আপডেট: 4 March 2026 12:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভাল চিকিৎসা মানে, তা অনেকের কাছেই অনেক দূরের শহরের ঠিকানা। রবিবার বনগাঁর মানুষদের কাছে, সেই দূরত্বটাই একটু কমল। বেঙ্গালুরুর অন্যতম শীর্ষ তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান মনিপাল হাসপাতাল হোয়াইটফিল্ড ও ভার্থুর রোড, বনগাঁয় তাদের নতুন আউটরিচ বহির্বিভাগ (OPD) পরিষেবা চালু করল।
এই নতুন শুরু উপলঙে বনগাঁর নীলদর্পণ ভবনে আয়োজিত হয় একটি কমিউনিটি-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য সেমিনার। এই সেমিনারে, চিকিৎসা মানে শুধু প্রেসক্রিপশন নয়, সচেতনতার কথাও উঠে আসে।
কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য স্পষ্ট। এলাকার মানুষের জন্য স্পেশ্যালাইজড চিকিৎসার ঘাটতি পূরণ করা। কারণ এই ধরনের এলাকার অনেকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় শহরে যেতে পারেন না। সেই বাধা কমাতেই এই পদক্ষেপ। পাশাপাশি, স্থানীয় প্রশাসন, চিকিৎসক সমাজ এবং ডায়াগনস্টিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করাও এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
নতুন পরিষেবার অংশ হিসেবে চালু হয়েছে একটি ইনফরমেশন সেন্টারও। এই কেন্দ্রের মাধ্যমে রোগীরা মনিপাল হাসপাতাল হোয়াইটফিল্ড ও ভার্থুর রোড, বেঙ্গালুরুর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শ নিতে পারবেন। অর্থাৎ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা এখন আরও সংগঠিত ও নির্দিষ্ট পথে পৌঁছবে বনগাঁর মানুষের কাছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পর্বতারোহণে অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত, মাউন্ট এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ সামিট করা পর্বতারোহী শ্রী দেবাশিস বিশ্বাস। স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব নিয়ে তিনি বলেন, “ভাল চিকিৎসা পরিষেবা সবার নাগালে থাকা উচিত। এই ধরনের কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ মানুষকে সচেতন করে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্ব বোঝায়।”
তাঁর কথায় বারবার উঠে আসে—সচেতনতা মানেই অর্ধেক চিকিৎসা।
এ দেশে বর্তমানে অল্প বয়সেই হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। তামাক সেবন, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এবং দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন ডা. (গ্রুপ ক্যাপ্টেন) আশিস চৌহান, ডা. প্রমোদ জে, ডা. রাজেশ শ্রীনিবাস এবং ডা. ভারত পি. সরকার।
মনিপাল হাসপাতাল হোয়াইটফিল্ডের কনসালট্যান্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. (গ্রুপ ক্যাপ্টেন) আশিস চৌহান বলেন, “শুরুর লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে অনেক সময় রোগীরা দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসেন, যখন চিকিৎসার বিকল্প সীমিত হয়ে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সময়মতো চিকিৎসাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।”
তিনি আরও জানান, “বর্তমানে মানসিক চাপ, ধূমপান এবং অলস জীবনযাপনের কারণে তরুণ ও মহিলাদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বাড়ছে।”
অ্যাসিডিটি, বদহজম, পেটের অস্বস্তি— এগুলোকে আমরা অনেকেই হালকাভাবে নিই। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা করলে তা বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
মনিপাল হাসপাতাল হোয়াইটফিল্ডের কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, ডা. প্রমোদ জে বলেন, “অ্যাসিডিটি, বদহজম ও পেটের অস্বস্তির মতো সমস্যা মূলত অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অস্বাস্থ্যকর খাবার, মানসিক চাপ এবং নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ খাওয়ার কারণে হয়। অনেক রোগী দীর্ঘদিন উপসর্গ উপেক্ষা করেন, ফলে পরে জটিলতা দেখা দেয়। অধিকাংশ গ্যাস্ট্রিক সমস্যাই জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। শুরুর দিকে সঠিক চিকিৎসা নিলে বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন কমানো যায়।”
মনিপাল হাসপাতাল ভার্থুর রোডের কনসালট্যান্ট অর্থোপেডিক ডা. রাজেশ শ্রীনিবাস বলেন,
“হাঁটুর ব্যথা এখন আর শুধু বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বারবার শারীরিক পরিশ্রম, বয়সজনিত ক্ষয়, স্থূলতা এবং চিকিৎসা না করা আঘাত দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা ও চলাচলের সমস্যার কারণ হতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়, ফিজিওথেরাপি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ সক্রিয় ও স্বনির্ভর জীবনযাপন করতে পারেন।”
অর্থাৎ, সময়মতো নজর দিলে অস্ত্রোপচারই শেষ কথা নয়।
কৃষক, চালক, দোকানদার, অফিসকর্মী— সকলেরই দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা বা ঝুঁকে কাজ করা এখন অনেকের দৈনন্দিন বাস্তবতা। তার ফল পিঠ ও ঘাড়ের ব্যথা। মাংসপেশির টান, স্লিপড ডিস্ক, স্পন্ডাইলোসিস, সায়াটিকা এগুলো এখন তরুণদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
মনিপাল হাসপাতাল হোয়াইটফিল্ডের কনসালট্যান্ট স্পাইন সার্জেন ডা. ভারত পি. সরকার বলেন, “শুরুর দিকে চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ মেরুদণ্ডের সমস্যায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। তবে বিপজ্জনক লক্ষণগুলি সময়মতো চিহ্নিত করে চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে স্থায়ী স্নায়ু ক্ষতি এড়ানো যায় এবং রোগীর জীবনমান উন্নত করা সম্ভব হয়।”
সেমিনারের শেষে ছিল ইন্টাব়্যাকটিভ প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং একটি স্বাস্থ্য কুইজ। সেমিনারে উপস্থিত লোকজন সরাসরি বিশেষজ্ঞদের কাছে তাঁদের প্রশ্ন রাখেন।
নতুন আউটরিচ OPD পরিষেবার মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং সহজলভ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে, বনগাঁর মাটিতে যে শুধু একটি পরিষেবা চালু হল তাই নয়, শুরু হয়েছে সচেতনতার এক নতুন অধ্যায়ও।