দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর হতে পারে বলে জানিয়েছে WHO। হৃদ্রোগ, ডিমেনশিয়া ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কেন বাড়ছে, জানুন বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

একাকিত্বের ক্ষতি।
শেষ আপডেট: 4 March 2026 17:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভিড় বাড়ছে, শহর বাড়ছে, অনলাইন বন্ধুর তালিকাও লম্বা হচ্ছে— তবু মানুষ যেন আগের চেয়ে বেশি একা। দিনের শেষে ফেরা হয় চার দেওয়ালে, আর সেখানে অনেকেরই ধরা দেয় এক অদৃশ্য শূন্যতা। এই একাকিত্বকে আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই বলেই সতর্ক করেছে World Health Organization (WHO)। বছর তিনেক আগে, তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদন Our Epidemic of Loneliness and Isolation-এ উঠে আসে এক চমকপ্রদ তথ্য। দীর্ঘমেয়াদি একাকিত্বের প্রভাব দিনে প্রায় ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর হতে পারে।
বস্তুত, কোভিড পর্ব ৫ বছর আগে পেরিয়ে গেলেও, নানাভাবে তার সামাজিক অভিঘাত রয়ে গেছে। লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব, সংক্রমণের ভয়— সব মিলিয়ে মানুষ ক্রমশ ঘরবন্দি জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভার্চুয়াল যোগাযোগই হয়ে উঠেছে বড় মাধ্যম।
WHO-র পর্যবেক্ষণ বলছে, এই পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই স্থায়ী হয়ে গিয়েছে। বহু মানুষ আগের মতো সামাজিক মেলামেশায় ফিরতে পারেননি। ফল—বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বয়সের মানুষ একাকিত্বের শিকার। কিশোর-কিশোরী থেকে প্রবীণ—কারও ক্ষেত্রেই সমস্যা কম নয়। বিশেষ করে শহুরে জীবনে কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক কাঠামোর বদল এবং ডিজিটাল নির্ভরতা একাকিত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
একাকিত্ব মানেই শুধু মনখারাপ নয়। WHO-র বিশ্লেষণ বলছে, দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডিমেনশিয়া, স্ট্রোক এবং অবসাদের ঝুঁকি বাড়ায়। একা থাকার অনুভূতি শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব পড়ে রক্তচাপ ও হৃদ্যন্ত্রের উপর। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়। এমনকি অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ক সামাজিক যোগাযোগের জন্যই তৈরি। সম্পর্কের অভাব মস্তিষ্কে এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যেন শরীর বিপদের মুখে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে তা শারীরিক অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
WHO স্পষ্ট করে জানিয়েছে, একা থাকা আর একাকিত্ব এক বিষয় নয়। অনেকেই স্বেচ্ছায় একা সময় কাটাতে পছন্দ করেন, যা মানসিক বিশ্রামের জন্য উপকারীও হতে পারে। কিন্তু যখন সামাজিক সংযোগের অভাব থেকে বিচ্ছিন্নতার বোধ তৈরি হয়, তখন সেটাই সমস্যা। সামাজিক সম্পর্কের গুণগত মান, সংখ্যা নয়— এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন যোগাযোগ সাময়িকভাবে সংযোগের অনুভূতি দিলেও তা মুখোমুখি সম্পর্কের বিকল্প নয়। ভার্চুয়াল মেলামেশা অনেক সময় তুলনার মানসিকতা বাড়ায়, যা অবসাদ ও হীনমন্যতার জন্ম দিতে পারে। তাই ডিজিটাল মাধ্যমের পাশাপাশি বাস্তব যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
WHO মনে করছে, একাকিত্ব ভবিষ্যতে ‘নীরব অতিমারি’র রূপ নিতে পারে। তাই এখন থেকেই ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্তরে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানো, সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়া, প্রবীণ বা একা থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া-- এসবই জরুরি বিষয় হিসেবে মাথায় রাখতে হবে।
পাশাপাশি, একাকিত্বকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে WHO। সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি—এই সহজ সত্যটিকেই যেন নতুন করে সামনে এনেছে এই প্রতিবেদন।