প্রথমেই একটা জিনিস বুঝতে হবে, শিশু জেদ করছে না, সে সত্যিই ভয় পাচ্ছে। তাই তাকে বকাঝকা নয়, দরকার বোঝানো।

শেষ আপডেট: 25 March 2026 20:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জলাতঙ্ক (Rabies) প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মুম্বইয়ের ৯ বছরের ছোট্ট মেয়ে কাশিসের। এই ঘটনা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, শিশুর ছোট্ট একটা ভয়ও কত বড় হয়ে উঠতে পারে। কারণ ৬ মাস আগে তার গায়ে যখন কুকুরের আঁচড় লেগেছিল, তখন যদি নিয়ম মেনে ইঞ্জেকশন নিত সে, তাহলে এড়ানো যেত এত বড় বিপদ।
অনেকেই ভাবেন, কুকুরের একটা আঁচড়ে আর কী হবে। তেমন কিছু হয়ওনি, কয়েকদিনেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল ক্ষত। কিন্তু একটা জিনিস থেকে গিয়েছিল, ইঞ্জেকশনের ভয়। সেই ভয়েই সে রেবিসের টিকা নেয়নি।
মাস ছয়েক পর, হঠাৎ অসুস্থতা। খাওয়া বন্ধ, জলও না। সেই সঙ্গে চোখ লাল হয়ে যাওয়া। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো যায়নি।
এই ঘটনাটা যেন একটা কঠিন সত্য সামনে আনে। শিশুর ছোট্ট ভয়ের ফল কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে।
অনেক শিশুই ইঞ্জেকশনের কতা শুনলেই ভয় পায়। এটা যদিও অস্বাভাবিক কিছু নয়। শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের মনে এই ভয়টা খুব বাস্তব।
ছুঁচের ব্যথা, হাসপাতালের গন্ধ, বা আগের কোনও খারাপ অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে তাদের মনে একটা ভয় তৈরি হয়।
অনেক সময় আবার তারা আগে থেকেই শুনে নেয়, 'ইঞ্জেকশন দিলে খুব ব্যথা লাগে।' বা তাদের ভয় দেখানো হয়, দুষ্টুমি করলে কিন্তু ইঞ্জেকশন দিয়ে দেওয়া হবে। এই কথাটাই তাদের ভয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়।
ফলে অনেক সময় ডাক্তার দেখানোর কথা শুনলেই তারা কান্না শুরু করে, লুকিয়ে পড়ে, বা যেতে চায় না।
বাচ্চাদের এই ছোট ভয়টাই অনেক সময় বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে টিকা নিতে দেরি হয়, কখনও পুরো কোর্সই শেষ করা হয় না। আর এর ফল হতে পারে মারাত্মক।
তার উপর রেবিস, সেপসিস, মেনিনজাইটিস— এই ধরনের রোগগুলো শুধু গুরুতরই নয়, অনেক সময় প্রাণঘাতীও হতে পারে, যদি সময়মতো চিকিৎসা না হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (World Health Organization) তথ্য বলছে, বিশ্বে রেবিসে মৃত্যুর বড় অংশই ঘটে ভারতে। অর্থাৎ, একটা ইঞ্জেকশন না নেওয়ার সিদ্ধান্ত কখনও কখনও জীবন-মৃত্যুর ফারাক তৈরি করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমেই একটা জিনিস বুঝতে হবে, শিশু জেদ করছে না, সে সত্যিই ভয় পাচ্ছে। তাই তাকে বকাঝকা নয়, দরকার বোঝানো।
এক্ষেত্রে মা-বাবাদের মাথায় রাখা ভাল, 'ভয় পেও না' বললে অনেক সময় কাজ হয় না। বরং বলা ভাল, 'আমি জানি তুমি ভয় পাচ্ছ, আমি তোমার সঙ্গে আছি।' এই ছোট্ট বাক্যটাই শিশুকে নিরাপত্তা দেয়।
হঠাৎ করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। এতে ভয় আরও বেড়ে যায়।
বরং আগে থেকেই তাকে বলা উচিত—কেন যেতে হবে, ইনজেকশন কেন দরকার।
সহজ ভাষায় বোঝানো—“এতে তুমি অসুস্থ হবে না।”
বাড়িতে খেলতে খেলতেও প্রস্তুতি নেওয়া যায়। যেমন, খেলনা দিয়ে ‘ডাক্তার-ডাক্তার’ খেলা। শিশুকে ডাক্তার বানানো। এতে পরিস্থিতিটা তার কাছে স্বাভাবিক লাগে।
শিশুরা বড়দের দেখে শেখে। ফলে বাবা-মা যদি নিজেরাই ইঞ্জেকশন নিয়ে ভয় পান বা উদ্বিগ্ন হন, সেটা খুব সহজেই শিশুর মধ্যে চলে আসে। তাই ক্লিনিকে গিয়ে মা-বাবারও শান্ত থাকা জরুরি।
হাত ধরে রাখা, গল্প বলা, মন অন্যদিকে ঘোরানো— এই ছোট ছোট জিনিসই বড় কাজ করে। অনেক মা-বাবাই বলেন, বাচ্চাকে ছুঁচ ফোটানোর দৃশ্য চোখে দেখতে পারি না, বাইরে থাকি। এটা করলে হবে না। মা-বাবার ভয়টা তো বাচ্চার মধ্যেও সংক্রামিত হবে। তাই সঙ্গে থাকতে হবে এবং ইঞ্জেকশন হয়ে যাওয়ার পর শিশুকে সাহসও জোগাতে হবে। সে কাঁদলেও বলতে হবে, “তুমি খুব ভাল করেছো, তোমার অনেক সাহস।”
এই প্রশংসাই পরের বার তার ভয় কমাতে সাহায্য করবে।
যদি শিশুর ভয় এতটাই বেশি হয় যে সে একেবারেই টিকা নিতে রাজি না হয়, তাহলে চিকিৎসক বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। কারণ এই ভয় কাটানো সম্ভব—শুধু সঠিকভাবে এগোতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ইঞ্জেকশনের ভয় শুধু শিশুদের নয়, অনেক বড়দেরও থাকে। কিন্তু সেই ভয়কে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে গেলে, তার মূল্য অনেক বড় হতে পারে। একটা ছোট্ট ছুঁচের ভয় আর একটা জীবনের নিরাপত্তা— দুটোর মধ্যে বেছে নিতে হলে, সিদ্ধান্তটা খুব কঠিন হওয়া উচিত নয়।
কারণ সময়মতো নেওয়া একটা টিকা, অনেক বড় বিপদকে খুব সহজেই দূরে সরিয়ে দিতে পারে।