অফিসের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ক্যানসার ধরা পড়ার পর সিনিয়র ম্যানেজারকে চাকরি ছাড়তে বলা হয়। সন্তোষ পাতোলের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছে কর্পোরেট দুনিয়ায় বৈষম্যের বড় প্রশ্ন।

সন্তোষ পাটোল।
শেষ আপডেট: 12 March 2026 12:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বহু বছর ধরে নিষ্ঠা ও পরিশ্রম দিয়ে একটি সংস্থার জন্য কাজ করেছেন। পদোন্নতি পেয়েছেন, পুরস্কার পেয়েছেন, প্রশংসাও কম পাননি। কিন্তু একদিন অফিসের রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ধরা পড়ল মারণরোগ— ক্যানসার। আর সেই মুহূর্ত থেকেই যেন বদলে গেল সবকিছু। কয়েক মাসের মধ্যেই চাকরি ছাড়তে বাধ্য হতে হল তাঁকে।
এই অভিজ্ঞতার কথাই প্রকাশ্যে এনেছেন পুণের সন্তোষ পাটোল। সেখানকারই একটি বহুজাতিক সংস্থায় সিনিয়র ম্যানেজার পদে কাজ করতেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতার গল্প এখন কর্পোরেট দুনিয়ায় কর্মীদের নিরাপত্তা ও মানবিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে সন্তোষের সংস্থার উদ্যোগে একটি রুটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার আয়োজন করা হয় কর্মীদের জন্য। সেই পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে বড় বিপদ। রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকেরা জানান— সন্তোষের শরীরে একটি টিউমার রয়েছে এবং সেটি নীরবে শরীরের ভিতরে ছড়িয়ে পড়ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে জানা যায়, এটি থাইরয়েড ক্যানসার।
বজ্রাঘাত নেমে আসে সন্তোষের জীবনে। এতদিন সম্পূর্ণ সুস্থ ভাবা শরীরে যে এমন একটি গুরুতর অসুখ বাসা বেঁধেছে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
এরপর আর দেরি করেননি চিকিৎসকেরা। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয় এবং খুব শিগগিরই তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। সৌভাগ্যবশত, তাঁর সংস্থার মেডিক্লেম পলিসির আওতায় চিকিৎসার খরচও বহন করা হয়।
ক্যানসারের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই আরও এক বড় আঘাত আসে। সন্তোষ জানিয়েছেন, রোগ ধরা পড়ার কিছুদিন পরেই, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তাঁর বস তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন।
এই সিদ্ধান্তে তিনি হতভম্ব হয়ে যান। তাঁর কথায়, 'এটা আমার কাছে আরও বড় ধাক্কা ছিল। আমি বুঝতেই পারিনি কী ঘটছে। গত কয়েক বছরে আমি ধারাবাহিকভাবে অসাধারণ কাজ করেছি। একাধিক পদোন্নতি, বোনাস এবং স্বীকৃতিও পেয়েছি।'
স্বাভাবিকবাবেই সন্তোষ কোম্পানির কাছে কারণ জানতে চান। ইমেল করে প্রশ্ন তোলেন, কেন তাঁকে রিজাইন করতে হবে? প্রায় এক মাস কোনও উত্তর না পেয়ে তিনি সংস্থার লিগ্যাল টিমকেও ইমেল পাঠান।
সন্তোষ জানান, সেই দ্বিতীয় ইমেলের পরে তাঁকে জানানো হয়— তাঁর কাজে নাকি কিছু ‘অসঙ্গতি’ বা anomalies পাওয়া গেছে। তবে সেই অভিযোগের পক্ষে কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ বা ব্যাখ্যা তাঁকে দেওয়া হয়নি।
সন্তোষের পাল্টা প্রশ্নও ছিল সোজাসাপ্টা। তিনি ফের মেল করেন, 'যদি এমন সমস্যা থেকেই থাকে, তাহলে আমাকে আগে জানানো হয়নি কেন? আর সেই কাজগুলো অ্যাপ্রুভই বা করলেন কে?'
কিন্তু এই প্রশ্নগুলির কোনও স্পষ্ট উত্তর পাননি বলেই জানিয়েছেন সন্তোষ।
সন্তোষ জানান, সেই সময় তাঁর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল চাকরিটা ধরে রাখা। তাঁক কথায়, 'আমি শুধু চাইছিলাম কোম্পানি আমাকে আবার কাজে ফিরিয়ে নিক। সেই সময় আমার চাকরিটা খুব দরকার ছিল, আর আমি এমন অবস্থায় ছিলাম যে নতুন চাকরির জন্য আবেদনও করতে পারছিলাম না।'
অবশেষে তিনি লিঙ্কডইন প্ল্যাটফর্মে তাঁর জীবনের এই ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আনেন। এমনকি প্রতিবাদের চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে তিনি অনশনের কথাও ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, 'আমি যখন অনশন শুরু করার কথা ঘোষণা করলাম, তখন কোম্পানির পক্ষ থেকে আবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তারা কেবল অনশন বন্ধ করতে বলেছিল, কাজে ফেরানোর কোনও লিখিত আশ্বাস দিতে রাজি হয়নি।'
সন্তোষ শেষ পর্যন্ত অনশনেও বসেন। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় পঞ্চম দিনে তাঁকে অনশন ভাঙতে হয়।
তবে এই প্রতিবাদ একেবারে বিফলে যায়নি। বিষয়টি জনসমক্ষে আসে এবং সংবাদমাধ্যমেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
এই ঘটনায় সামনে আসে কর্মক্ষেত্রের একটা বড় অমানবিক জায়গা। গুরুতর অসুস্থতার কারণে কর্মীদের বিরুদ্ধে এভাবে চাকরি ছাড়ানোর পদক্ষেপ আদতে আইনগত সুরক্ষারই অভাব হিসেবে ফুটে ওঠে।
সন্তোষের মতে, ভারতের শ্রম আইন ব্যবস্থায় এমন কোনও স্পষ্ট আইন নেই যা ক্যানসারের মতো গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত কর্মীর কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
যেমন কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে POSH আইন (Prevention of Women at Workplace Act, 2013) রয়েছে, যেখানে অভিযোগ জানাতে একটি অভ্যন্তরীণ অভিযোগ ব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক, কিন্তু গুরুতর অসুস্থতার কারণে বৈষম্যের ক্ষেত্রে তেমন কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই নেই।
বস্তুত, সন্তোষের ঘটনা নিয়ে তোলপাড় ঘটলেও, কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত অনেক কর্মীকেই হঠাৎ চাকরি হারাতে হয়। অনেক সময় তাঁদের জোর করে পদত্যাগ করানো হয়। অভিযোগ জানানোর বা প্রতিকার পাওয়ার মতো কোনও পরিষ্কার ব্যবস্থা থাকে না।
ফলে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর ইচ্ছামতো সিদ্ধান্তের সামনে কর্মীরা অসহায় হয়ে পড়েন।
কিন্তু সন্তোষ পাটোলের ঘটনা এর পাঁচজনের মতো নিঃশব্দে ঘটেনি। তিনি পদত্যাগ করেননি, বরং এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জানা গেছে, মহারাষ্ট্র বিধানসভায় একটি Private Member Bill আনার জন্যও চেষ্টা করছেন সন্তোষ পাতোল। এই বিলের উদ্দেশ্য হল কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসাজনিত বৈষম্য মোকাবিলার জন্য আইনি কাঠামো তৈরি করা।
সম্প্রতি তিনি বিধায়কদের কাছে চিঠি লিখে এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অনুরোধও করেছেন। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, POSH আইনের মতোই একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করার কথা ভাবা হচ্ছে। যেখানে চিকিৎসাজনিত বৈষম্যের অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকবে।
এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে, চিকিৎসার কারণে কর্মীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য বন্ধ করা, অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি সুস্পষ্ট ব্যবস্থা তৈরি করা, কর্মীদের কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সন্তোষ পাতোলের এই গল্প শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের গল্প নয়।
এটি সেই সব হোয়াইট কলার জবের কর্মীদের বাস্তবতাও তুলে ধরে, যাঁরা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে কর্পোরেট সংস্থার ভিত মজবুত করেন। কিন্তু অসুস্থতা বা দুর্বলতার মুহূর্তে অনেক সময় সেই সংস্থাগুলোর কাছ থেকেই তাঁরা উদাসীনতা বা অমানবিক আচরণের মুখে পড়েন।
অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের সরিয়ে দেওয়া হয় শুধু সস্তা বিকল্প খোঁজার জন্য বা এমন সময়ে, যখন তাঁরা সবচেয়ে বেশি অসহায়।
সন্তোষের লড়াই তাই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি, কর্মীদের সুরক্ষা এবং কর্পোরেট নীতির মানবিকতা নিয়ে। এখন প্রশ্ন হল, কীভাবে কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা ও নিরাপত্তা শুধু প্রতিশ্রুতি হয়ে না থেকে বাস্তবায়িত করা যায়!