
তিরুপতিতে ভক্ত সমাগম
শেষ আপডেট: 9 January 2025 16:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: “দেবী-আজ্ঞা নিত্যকাল ধ্বনিছে জগতে।/ সেই তো বধিরতম যেজন সে বাণী/ শুনেও শুনে না।” মন্দিরে নয়, দেবীর চিরায়ত অধিষ্ঠান বিশ্বজগতে। ‘বিসর্জন’ নাটকে রাজা গোবিন্দমাণিক্যের এই উক্তি যদিও ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি, ঠেকিয়ে রাখতে পারে না ভক্তোন্মাদ নাগরিকদের। যার সর্বশেষ উদাহরণ তিরুপতি মন্দিরের ঘটনা। বুধবার রাতে সেখানে ভক্তদের ভিড়ে তাড়াহুড়োয় পদপিষ্ট হয়ে ছ-জনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত ১৫ জন।
একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এভাবে সমূহ মৃত্যু কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। কখনও বৈষ্ণোদেবী, কখনও লোকনাথধাম—পায়ে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ফি-বছর লেগে রয়েছে। কিন্তু এই দুর্ঘটনার আসল কারণটি কী? শুধুই কি প্রশাসনিক গাফিলতি? নাকি উন্মত্ত জনতার অনিয়ন্ত্রিত আবেগ?
‘ফ্যাক্টলি ডট ইন’ নামে একটি সংস্থা এই নিয়ে সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০১ থেকে ২০১৪-র মধ্যে সারা দেশে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ পদিপিষ্ট হন। তার মধ্যে ২ হাজার ২৪১ জনের মৃত্যু হয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশনে’ প্রকাশিত রিপোর্ট (২০১৩) অনুসারে, সারা দেশে ৭৯ শতাংশ পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনাস্থল মন্দির বা মন্দির সংলগ্ন অঞ্চল।
এই নিয়ে বিশদে গবেষণা করেছেন যিনি তাঁর নাম জেফ ওয়াইজ। জেফ, একজন বিজ্ঞান বিষয়ক ফিচার লেখক, বলেছেন, ভিড়ে চাপাচাপিতে মরে যাওয়া সংক্রান্ত দুর্ঘটনার সাধারণত দুটো কারণ রয়েছে। একটিকে বলা যায় ‘দিকশূন্যহীনতা’। অন্যটিকে ‘প্রাবল্য’।
প্রথম ক্ষেত্রে পজিটিভ ও নেগেটিভ—দুধরনের বেগ বদল হয়, যখন সম্মিলিত জনতা তাড়াহুড়ো করে কোথাও ঢুকতে যায়। পজিটিভের ক্ষেত্রে কোথাও সামনে থেকে দরজা বা আগল পড়ে। নেগেটিভের ক্ষেত্রে দুয়ার বন্ধ হয়। পরিচিত উদাহরণ মহাপুষ্কারালুর ঘটনা, যেখানে গেট খুলে যাওয়া পরমুহূর্তে দীর্ঘক্ষণ ধরে থমকে থাকা ভক্তগণ হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে যায় (নেগেটিভ বেগের পরিবর্তন) এবং পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
পজিটিভ বেগ বদলের ক্ষেত্রে ঠিক উলটো ছবি। যখন সামনে আগল পড়ে, তখন পেছনে থাকা জনতা বুঝতে পারে না যে তাদের সামনের লোকজন দাঁড়িয়ে পড়েছে। ফলে তালমিলের অভাবে একে অন্যের গায়ে পড়তে থাকে, পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার সুযোগটুকুও থাকে না। ফল শোচনীয় মৃত্যু।
দ্বিতীয় কারণ, অর্থাৎ প্রাবল্যের জেরে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যখন দু-দিক থেকে সম্মিলিত জনতা এগিয়ে আসে অথবা কোনো গুজব আচমকা ছড়িয়ে পড়ে। সুষ্ঠুভাবে চলতে থাকা ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজনও ভয় পেয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে দুর্ঘটনা এড়ানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের ক্ষেত্রে গোদের উপর বিষফোড়া এই যে, এখানে একাধিক দেবমন্দির পাহাড়ে রয়েছে। যা স্বভাবতই দুর্ঘটনার হারকে ত্বরান্বিত করেছে। পরিকাঠামোর অভাব, পিছল রাস্তা, প্রতিকূল আবহাওয়া দুর্যোগ, দুর্ভোগ ও বিপত্তি ক্রমশ বাড়ায়।
তাহলে এক্ষেত্রে উপায় কী? প্রথমত, আয়োজক সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বুঝে জনসাধারণের সমাগমের অনুমোদন দিতে হবে। কতটা জায়গায় ক-জন ধরতে পারে, তার আগাম হিসেব অবশ্যই ছকে ফেলা উচিত। দ্বিতীয়ত, ঢোকা ও বেরোনোর দুটো আলাদা গেট নির্দিষ্ট করতে হবে। তৃতীয়ত, পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা যেন পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। এ ছাড়া, টিকিট কাটার ব্যবস্থা, সিসিটিভি-র নিখুঁত নজরদারি, ভিড়ের ঘনত্ব সময়বুঝে নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন মাইকিং, ইলেকট্রিসিটির যথেষ্ট জোগান… পদপিষ্ট-জনিত দুর্ঘটনা এড়ানোর একাধিক পন্থা রয়েছে। অতএব নতুন কোনো রীতি প্রণয়ন নয়, সমস্ত উপায়কে কাজে লাগানোটাই হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।