
শেষ আপডেট: 11 December 2023 09:06
মধ্যপ্রদেশে ভেঙে ছত্তীসগড় রাজ্য তৈরি হওয়ার পর প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা অজিত যোগী। অজিত ছিলেন আদিবাসী নেতা। ২০০৩ সালে তাঁকে তথা কংগ্রেসকে পরাস্ত করে বিজেপি ছত্তীসগড় দখল করতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু জনজাতি অধ্যুষিত রাজ্যে কোনও আদিবাসী মুখকে মুখ্যমন্ত্রী করতে পারেনি। কেন বিজেপি সেদিন তা পারেনি, আর কেনই বা দ্বিতীয় আদিবাসী মুখ্যমন্ত্রী পেতে ছত্তীসগড়ের বিশ বছর লেগে গেল, এই প্রতিবেদন তা নিয়েই। যার নেপথ্যে রয়েছে এক রোমহর্ষক ঘটনা।
ছত্তীসগড় পৃথক রাজ্য গঠনের কৃতিত্ব ছিল অটল বাজপেয়ী সরকারের। কিন্তু ২০০০ সালে যখন ছত্তীসগড় রাজ্য তৈরি হয়, তখন অবিভক্ত মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের সরকার ছিল। সেই সুবাদেই অজিত যোগী প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন। নতুন রাজ্য তৈরি হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী পদে বসতে তাঁকে পুনরায় ভোটে জিতে আসতে হয়নি।
হিন্দিবলয়ের এই রাজ্যে প্রথম বিধানসভা ভোট হয় ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। ততদিনে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে একে তো প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তীব্র হয়ে উঠেছিল। সেই সঙ্গে পৃথক রাজ্য গঠনের জন্য মানুষের মনে কৃতজ্ঞতা বোধও ছিল বিজেপি তথা বাজপেয়ীর প্রতি। তা ছাড়া ছত্তীসগড়ের জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় জনভিত্তি গড়ে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন আদিবাসী নেতা দিলীপ সিং জুদেও। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত করেছিল আরএসএসের বনবাসী কল্যাণ আশ্রম।
দিলীপ ছ’ফুটের বেশি লম্বা ছিলেন। ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি। ইয়া মস্ত গোঁফ। এহেন দাপুটে জনজাতি নেতাকে কেন্দ্রে পরিবেশ মন্ত্রী করে রেখেছিলেন বাজপেয়ী। এ কথা সবাই জানত যে ছত্তীসগড়ে বিজেপি জিতলেই মু্খ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন দিলীপ সিং জুদেও।
ডিসেম্বরে ভোট হয়েছিল ছত্তীসগড়ে। কিন্তু নভেম্বর মাসে হঠাৎই দিলীপের বিরুদ্ধে একটা স্টিং অপারেশনের ভিডিও ফাঁস হয়ে যায়।
সেই ভিডিওতে দেখা যায়, দিলীপ টাকা ঘুষ নিচ্ছেন। আর গোঁফে তা দিতে দিতে বলছেন, “প্যায়সা খুদা তো নেহি, পর খুদা কি কসম, খুদা সে কম ভি নেহি”।
এহেন ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর আর দিলীপের মুখ দেখানো জো ছিল না। ২০০৩ সালের ১৭ নভেম্বর বাজপেয়ী মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিতে হয় দিলীপ সিং জুদেওকে। বিধানসভা ভোটে দিলীপ আর প্রচারও করেননি। বলা ভাল, দল তাঁকে আর ব্যবহার করেনি। কিন্তু এ ঘটনার পরেও বিজেপি সেই ভোটে বিপুল ব্যবধানে জিতে যায়। তার পর এক প্রকার বাধ্য হয়ে রাজপুত নেতা রমন সিংকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসান বাজপেয়ী-আডবাণী। কারণ, আর কোনও ওজনদার জনজাতি নেতা তখন ছিল না ছত্তীসগড় বিজেপিতে।
ছত্তীসগড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা হল বনাঞ্চল। রাজ্যে ৩২ শতাংশের বেশি মানুষ জনজাতি সম্প্রদায়ের। ফলে সেখানে জনজাতি মুখকে মুখ্যমন্ত্রী করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তা ছাড়া জনজাতি এলাকায় যেহেতু বিচ্ছিন্নতা তথা মাওবাদী সমস্যা রয়েছে তাই আদিবাসী নেতাকে রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে বসানোটাই বাস্তবসম্মত।
কিন্তু ঘটনা হল, রমন সিং মুখ্যমন্ত্রী পদে বসে অচিরে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ছত্তীসগড়ই প্রথম রাজ্য যারা ২০০৪-০৫ সাল থেকে রেশনে ১ টাকা কেজি দরে চাল দিচ্ছে গরিব মানুষকে। সে কারণে রমন সিং ছত্তীসগড়ে ‘চাওলওয়ালে বাবা’ নামেও পরিচিতি পেয়ে যান।
২০০৮, ২০১৩ সালে বিধানসভা ভোটেও অনায়াসে জিতে যান রমন সিং। তাই মুখ্যমন্ত্রী পদে বদলের কথা তখন আর ভাবার সুযোগও ছিল না। শেষমেশ ২০১৮ সালে বিধানসভা ভোটে বিজেপি হেরে যায়। জিতে যায় কংগ্রেস। কিন্তু সাবেক জাতীয় দলেও ছত্তীসগড়ে মজবুত কোনও জনজাতি নেতা তখন ছিল না। ফলে ওবিসি নেতা তথা তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ভূপেশ বাঘেলকেই মুখ্যমন্ত্রী করে কংগ্রেস।
কিন্তু এবার ছত্তীসগড় বিধানসভা ভোটে জনজাতি এলাকায় স্যুইপ করেছে বিজেপি। সারগুজা এলাকায় ১৪টি আসনের মধ্যে ১৪টিতেই জিতেছে। বাস্তারে ১২টি আসনে জিতেছে গেরুয়া শিবির। তাই জনজাতি মুখকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসাতে চেয়েছেন অমিত শাহ-নরেন্দ্র মোদীরা। রমন সিংকে এবার ছত্তীসগড় বিধানসভার কৌশল নির্ধারণে খুব বেশি জড়ায়নি কেন্দ্র নেতৃত্ব। বরং অমিত শাহরাই যা করার করেছেন। ফলে রমনের দাবিও এখন আর জোরালো নয়।
রবিবার বিজেপির পরিষদীয় দলের বৈঠকে সারগুজা এলাকার কুনকুরি বিধানসভার বিধায়ক বিষ্ণু দেও সাইকে নেতা নির্বাচিত করা হয়। এই আদিবাসী নেতাই মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেবেন। অর্থাৎ বিশ বছর বাদে দ্বিতীয় জনজাতি মুখ্যমন্ত্রী পেতে চলেছে ছত্তীসগড়, যা বিশ বছর আগেই পাওয়ার কথা ছিল।