
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 9 February 2025 20:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মণিপুরে জাতি দাঙ্গা শুরু হয়েছিল ২০২৩-এর ৩ মে। মাসখানেকের মাথায় মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়েছিল রাজ্য। মাস ছয়েকের মাথায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজভবনের দিকে রওনা হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু নাটকীয় ঘটনা ঘটে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে। একদল মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে পদত্যাগ পত্র কেড়ে নেন। তারা দাবি করেন, বীরেনের পদত্যাগ করা চলবে না। গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি ফিরে যান এন বীরেন সিং। তারপর কী এমন ঘটল যে রবিবার আচমকাই পদত্যাগ করলেন মনিপুরের মুখ্যমন্ত্রী?
আসলে দলীয় বিধায়কদের আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন বীরেন সিং। বিশেষ করে তার স্বজাতি মৈতেই বিধায়করা পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ৬০ আসনের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ৩১ জন বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন। সেখানে বীরেনের পাশে বর্তমানে আছেন মাত্র ১৫ জন বিধায়ক। তাঁদের মধ্যে আবার জেডিইউ এবং নির্দল বিধায়কেরাও আছেন। বস্তুত বিজেপির সিংহভাগ বিধায়কের আস্থা হারিয়ে গদি বাঁচানোর তুমুল চেষ্টা চালাচ্ছিলেন বীরেন সিং। কিন্তু এবার দিল্লি সফরে আগাগোড়া পাশে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে বীরেনকে সরে যেতে বলেন। শাহের সিদ্ধান্ত জানার পর কালক্ষেপ করেননি বীরেন।
ঘটনা হল, এক বছর আগে বীরেন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কুকি জনজাতির আন্দোলনের চাপে। স্বজাতি বীরেনকে তখন রক্ষা করতে এগিয়ে গিয়েছিল মৈতেইরা। মৈতেইদের নারী সংগঠনের সদস্যরাই ঘিরে রেখেছিল মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন। তারা মনে করেছিল স্বজাতি বীরেনের পদত্যাগ কুকিদের সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের পিছিয়ে দেবে।।বীরেন থাকা মানে মৈতেইরা নিরাপদ।
কিন্তু মৈতেইদের আশা পূরণ হয়নি। কুকিদের আক্রমণ থেকে মৈতেইদের রক্ষা করতে পারেনি বীরেনের সরকার। গত এক-দেড় মাসে বেশিরভাগ হামলার শিকার হয়েছে মৈতেইরা। তার আগেই পনেরজন বিধায়ক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখে বীরেনের অপসারণ দাবি করেন। তাঁদের সিংহভাগ মৈতেই সম্প্রদায়ের। দিন কয়েক আগে উনিশজন বিধায়ক প্রকাশ্যে বীরেনের পদত্যাগ দাবি করেন। তাঁদেরও বেশিরভাগই ছিলেন বিজেপির।
দলেরই সিংহভাগ বিধায়কের আস্থা হারিয়েছেন বুঝে বিধানসভার অধিবেশন ডাকছিলেন না বীরেন। আস্থা ভোটে পরাজয়ের ভয়ে গত বছর বিধানসভার শীতকালীন অধিবেশন পর্যন্ত ডাকেননি। চলতি ফেব্রুয়ারিতে বিধানসভার বাজেট অধিবেশন ডাকা নিয়েও টালবাহানা করছিলেন। দিন গুণছিলেন অমিত শাহের মুখ থেকে বিজেপি বিধায়কদের তাঁর পাশে থাকার বার্তার জন্য।
কিন্তু বীরেনের সেই ইচ্ছায় জল ঢালে গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নির্দেশ। গত বছর একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছিল। তাতে একজনকে কুকিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্য করতে শোনা যায়। অভিযোগ ওই কণ্ঠস্বর মুখ্যমন্ত্রী বীরেনের। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে হওয়া মামলায় প্রধান বিচারপতি সরকারের কাছে ওই ফোনালাপের ফরেনসিক রিপোর্ট চেয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দিল্লিতে তলব করেন বীরেনকে। জাতি দাঙ্গা শুরুর পর থেকে এতদিন পর্যন্ত বীরেনকে সমর্থনযোগে গিয়েছেন শাহ। মনে করা হয় সেই কারণেই মণিপুর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মাথা গলাননি। কিন্তু চলতি পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে বীরেনকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হল। রাজনৈতিকভাবে এই বার্তাও দেওয়া গেল যে কুকি নয়, বীরেনকে সরতে হল স্বজাতি মৈতেইদের চাপে। এইভাবে মণিপুরের রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখল মৈতেইরা।