
কুণাল কামরা
শেষ আপডেট: 25 March 2025 12:15
বিতর্ক ছুঁয়েছে আকাশ আর মৌখিক হুঙ্কার পেরিয়ে ভেঙেচুরে গেছে স্টুডিও। তাতেও থমকে নেই বিষয়টা। মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী ও শিবসেনা নেতা একনাথ শিন্ডেকে কৌতুকের ছলে ‘অপমান’ করার বড় রকম মাশুল গুনতে শুরু করেছেন কমেডিয়ান কুণাল কামরা।
তবে যাঁকে ঘিরে এত কিছু, সেই কৌতুকাভিনেতা কিন্তু আপাত-নির্বিকার। সাফ জানিয়েছেন, আদালত নির্দেশ দিলেই তিনি ক্ষমা চাইবেন। নচেৎ নয়।
আর এখানেই বাকিদের থেকে আলাদা হয়ে গেছেন, বলা ভাল, বারবারই আলাদা হয়ে যান কুণাল কামরা। সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র যখন বিরুদ্ধে, বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে একের পর এক শো, দেশের সর্বত্র জারি করা হচ্ছে ফতোয়া, তখনও কুণাল তাঁর বক্তব্যে অনড়। একচুল সরতে নারাজ৷ গণতান্ত্রিক দেশের স্বাধীন নাগরিকের স্বধর্মে স্থির থাকার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। হাতে সংবিধান ধরে সেই বার্তাই নিঃশব্দে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন তিনি।
খুব সহজ নয় এমন স্থির থাকা। কারণ, ঝামেলা বড় কম হচ্ছে না। মুম্বইয়ের খার এলাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ‘হ্যাবিট্যাট’ নামে যে স্টুডিওতে তিনি ‘নয়া ভারত’ শীর্ষক স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো-টি পারফর্ম করেছিলেন, সেখানে শিন্ডেসেনারা তাণ্ডব চালিয়েছে। দায়ের হয়েছে এফআইআর। আছড়ে পড়ছে একের পর এক হুমকি ফোন। উপমুখ্যমন্ত্রীর শিবিরের এক অনুগামী ‘দেখে নেওয়া’র চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে। জানানো হয়েছে আগামী দিনে শো করা তো দূর অস্ত, কুণাল কীভাবে সারা দেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করেন, সেটাও তাঁরা বুঝিয়ে দেবেন। ক্ষমা চাওয়ার নিদান দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ।
এমনই তোলপাড় সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি পোস্ট করেছেন কুণাল। ব্যাকড্রপে সেই একই ভেন্যু, যেখানে তিনি পারফর্ম করেছিলেন। ছবির কেন্দ্রে তিনি৷ হাতে ধরা ভারতের সংবিধান। ক্যাপশনে লেখা: ‘এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ’।
এত ঘটনার ঘনঘটার নেপথ্য কারণ ছিল কৌতুক। আর একটু ভেঙে বললে, ‘প্যারোডি’। শোয়ের একটি পর্বে উদ্ধব ঠাকরের দল ভাঙিয়ে যেভাবে মুখ্যমন্ত্রীর মসনদ দখল করেছিলেন একনাথ শিন্ডে, সেদিকে ইঙ্গিত করে শাখরুখ খান অভিনীত একটি চলচ্চিত্রের গানের শব্দ পালটে মজার ছলে নাম না করে তাঁকে ‘গদ্দার’ বা বিশ্বাসঘাতক বলে কটাক্ষ করেন কুণাল৷ তারপরই মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ঝড় ওঠে। শিবসেনার তাণ্ডব তো ছিলই। ‘ভাঙচুরে’ হাত লাগায় প্রশাসনও৷ বৃহন্মুম্বই পুরসভা স্টুডিওর একাংশ ভেঙে দেয়। কৈফিয়ত হিসেবে জানানো হয়, যেহেতু নির্মাণটি অবৈধ ছিল, তাই এই পদক্ষেপ।
এই প্রথম নয় অবশ্য। গত পাঁচ বছরে কত কী-ই না সহ্য করে যেতে হয়েছে! শুরুয়াত হয়েছিল ২০২০ সালে। জানুয়ারি মাসে ইন্ডিগো বিমানে চড়ে লখনউ যাচ্ছিলেন কুণাল৷ উড়ানে সহযাত্রী ছিলেন সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামী৷ সেই সময় অর্ণবকে বেশ কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেন কুণাল। তাঁরই প্রসিদ্ধ লব্জ ধার করে জিজ্ঞেস করতে থাকেন, ‘আপনি সাংবাদিক না কাপুরুষ, নেশন ওয়ান্টস টু নো!’
একজন কমেডিয়ানের রাজনীতি-ঘেঁষা ধারালো সওয়ালের সামনে সেদিন নিরুত্তর ছিলেন সাংবাদিক। গোটা ঘটনার ভিডিও খানিক বাদেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এই আচরণকে ‘অপ্রীতিকর’ বলে দেগে দেয় বিমান সংস্থা ইন্ডিগো। ছ'মাসের জন্য কুণালকে তাদের বিমানে চড়তে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একইভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে গো এয়ার, স্পাইসজেট এবং এয়ার ইন্ডিয়াও৷
আজকের মতো সেদিনও ‘কর্নার’ করা হয়েছিল কুণালকে। এবার যেমন স্বধর্মে দাঁড়িয়ে সংবিধান হাতে বাকস্বাধীনতার মূলসূত্রটি সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, সেবারও নিজের ‘পেশা’র ভিত্তি কৌতুককেই হাতিয়ার করেছিলেন তিনি৷ জানিয়েছিলেন, কোনও যাত্রীর নিরাপত্তায় ব্যাঘাত ঘটাননি৷ তাহলে ক্ষমা চাইবেন কীসের জন্য? তা ছাড়া ইন্ডিগোয় যা কিছু ঘটে থাকুক না কেন, বাকি সংস্থা কীসের ভিত্তিতে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে?
কিন্তু কুণাল বিচক্ষণ। তদুপরি রসিক। তাই বিমানসংস্থাদের উদ্দেশে এলোপাথাড়ি ঢিল না মেরে মোক্ষম পাটকেলটি ছুড়েছিলেন মৌচাকে—নিশানা করেছিলেন সরাসরি নরেন্দ্র মোদীকে। বিলক্ষণ জানতেন কার অঙ্গুলিহেলনে তাঁকে কোণঠাসা করা হচ্ছে। কোনও রকম পদ্ধতি না মেনে, তদন্ত কমিটি বসিয়ে ছানবিন না করে বয়কট করা হচ্ছে। সমাজমাধ্যম ‘এক্স’ (তখন টুইটার)-এ সরাসরি প্রশ্ন করেন: ‘মোদীজি, আমি কি হাঁটতে পারি, নাকি এখন থেকে এটাও নিষিদ্ধ?’ ‘নো ফ্লায়ার’ তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কোনও তৈলমর্দন কিংবা তোয়াজের রাস্তায় হাঁটেননি তিনি৷
যদিও ওই সাংবাদিককে নিয়ে বিতর্ক এখানেই থেমে থাকেনি৷ সে বছরই নভেম্বর মাসে অর্ণব গোস্বামীর বিরুদ্ধে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার অন্বয় নায়েক ও তাঁর মা কুমুদ নায়েককে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। গ্রেফতার হন তিনি৷ এক সপ্তাহ পর জামিন দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এই প্রসঙ্গে দেশের শীর্ষ আদালতকে নিশানা করে লাগাতার টুইট করে যান কুণাল৷ ওঠে আদালত অবমাননার অভিযোগ।
সেদিন প্রতিপক্ষ বদলে গিয়েছিল। কিন্তু ইস্যু ছিল একটাই: বাক-স্বাধীনতা! গোটা ঘটনায় কুণাল যেভাবে সীমা উল্লঙ্ঘন করে সুপ্রিম কোর্ট ও বিচারপতিদের ব্যঙ্গ করেছেন, তা যে এক্তিয়ার-বহির্ভূত কাজ, সে কথা ধরা পড়ে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপালের মন্তব্যে: ‘আজকাল মানুষ খুব সাহসী হয়ে নির্লজ্জের মতো সুপ্রিম কোর্ট এবং বিচারপতিদের সমালোচনা করে মনে করে এটাই বাক্-স্বাধীনতা।’
এই স্বাধীনতার অধিকারে সেবারও অনড় ছিলেন কুণাল৷ মামলা-মোকদ্দমা, আইনজীবী দাঁড় করানোর রাস্তায় না হেঁটে একজন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকের মৌলিক অধিকারটুকু ফের একবার মনে করিয়ে জবাব দেন: ‘টুইটগুলি প্রত্যাহার করার বা ক্ষমা চাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই৷ কোনও আইনজীবী নয়, ক্ষমা নয়, জরিমানা নয়, স্থানের অপচয়ও নয়।’
পরে তাঁর আচরণে বিচারবিভাগ কালিমালিপ্ত হয়েছে আর এজন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত—এই মর্মে সুপ্রিম কোর্টের আইনি নোটিস পাঠালে কুণাল এফিডেভিটে লেখেন: ‘বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তার কাজের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাকে নিয়ে করা সমালোচনার উপর নয়।’
কোনও প্রতিষ্ঠান, তা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সব রকম সমালোচনার ঊর্ধ্বে, গণতন্ত্রে এটা ভাবাও অন্যায্য—সংবিধানের অন্যতম নির্যাস সেদিনও আওড়েছিলেন কুণাল।
রাষ্ট্রযন্ত্র, আইন, আদালত এবং অতি অবশ্যই দেশভক্তি। কমেডিয়ান তাঁর কৌতুক এবং কাণ্ডজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সমস্ত ইস্যুকে আবিলতামুক্ত করতে চেয়েছেন। দেশপ্রেমের ফানুস ওড়াতে চেয়েছে বিজেপি আর তাই বার্লিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দেশাত্মবোধক গান শোনানো এক ছোট্ট বাচ্চার ভিডিও নেটমাধ্যমে ভাইরাল করেছে তারা। এই নিয়েও প্রতিবাদে সরব হন কুণাল। কিন্তু চাঁচাছোলা ভাষণ নয়। বেছে নেন কৌতুককেই। সেবারও অস্ত্র ছিল প্যারোডি।
বাচ্চা ছেলেটির গাওয়া ‘হ্যায় জন্মভূমি ভারত'-কে বিঁধে তিনি গেয়েছিলেন ‘পিপলি লাইভ’ ছবির ‘মেহেঙ্গাই ডায়েন খায়ে জাত হ্যায়’। যার বয়ানে উঠে এসেছে লাগাতার মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ৷ নরেন্দ্র মোদীকে ‘জনপ্রিয় সন্তানে'র তকমা দিয়ে কুণাল বলেন, ‘আমি কোনও রসিকতাও করিনি। ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। শুধু বলতে চেয়েছি দেশবাসী যে গান গাইছে, দেশের জনপ্রিয় সন্তানের সেটাও শোনা উচিত।’
এরপর কখনও হিন্দু দেবদেবীকে অপমান করেছেন কুণাল—এই অভিযোগে গায়ের জোরে গুরুগ্রামে তাঁর অনুষ্ঠানে চড়াও হয়েছে বজরং দল, কখনও ‘কাশ্মীর ফাইলস’-এর সমালোচনার জেরে আইজীবীরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সুপ্রিম কোর্টে মামলা রুজু করেছেন। কুণাল কিন্তু একটি ক্ষেত্রেও ধর্মচ্যুত, লক্ষ্যভ্রষ্ট হননি৷ সর্বদাই স্বধর্মে স্থিত থেকেছেন।
একদা সুপ্রিম কোর্টের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এফিডেভিটে কৌতুকাভিনেতা লিখেছিলেন, তাঁর রঙ্গরসিকতা দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী আদালতের ভিত নাড়িয়ে দেবে, এমনটা ভাবা তাঁর কর্মক্ষমতার অতিরঞ্জন। আসলে একজন কমেডিয়ানের দায়িত্ব ও সীমা-সরহদ্দ সম্পর্কে বিলক্ষণ সচেতন কুণাল কামরা। মৌচাকটি কোথায়, সেটা তাঁর জানা। হাতে ঢিল রয়েছে। অব্যর্থ লক্ষ্যভেদে পারঙ্গম। তাই মুখ লুকোনো কিংবা পিছিয়ে আসার প্রশ্নই ওঠে না!
প্রমথনাথ বিশী হাস্যরস নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে একবার বলেছিলেন, ‘নিছক কৌতুকহাস্য বাদ দিলে দেখা যাবে যে, হাসি যে জাতেরই হোক না কেন তা Social Criticism ছাড়া আর কিছুই নয়।’ আর এই ক্রিটিসিজম বা সমালোচনার আবশ্যিক অঙ্গ, প্রমথনাথের মতে, ‘প্রচ্ছন্ন তিরস্কার’।
কুণাল কামরা আপাতত সেই তিরস্কারেরই পুরস্কার পাচ্ছেন!