
শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায় একের পর এক আক্রমণে কেন বিদ্ধ করছেন কংগ্রেস বিশেষ রাহুল গান্ধীকে।
শেষ আপডেট: 31 December 2024 13:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রণব-কন্যা শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়ের কংগ্রেস থুড়ি রাহুল গান্ধীর উপর এত রাগ কেন? একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি ও আজীবন কংগ্রেসি নেতা প্রয়াত প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে ধারাবাহিকভাবে বাবার প্রতি দলের অসম্মান, অশ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং স্বীকৃতি না দেওয়ার অভিযোগ তুলে চলেছেন। সম্প্রতি এর জন্য তিনি তাঁর দাদা অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়কেও কাঠগড়ায় তুলতে কসুর করেননি। বছরের শেষে শর্মিষ্ঠা ফের একবার কংগ্রেস ও গান্ধী পরিবারের একনিষ্ঠ অনুগামী প্রণব মুখোপাধ্যায়কে একসময় 'সঙ্ঘী' বলার জন্য রাহুল গান্ধীর নাম করেই তাঁর 'ভক্ত চেলা'দের একহাত নিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায় একের পর এক আক্রমণে কেন বিদ্ধ করছেন কংগ্রেস বিশেষত রাহুল গান্ধীকে। তাহলে কি প্রণব-কন্যা শর্মিষ্ঠা নতুন বছরে বাবার শিবির ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিতে চলেছেন? রাজধানীর রাজনীতির অন্দরে আপাতত সেরকমই কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে। সকলের মনেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, এসব কি তারই পটভূমি তৈরির কাজ চলছে? রাজনীতিতে দাদা অভিজিতের 'ব্যর্থতা'র পর এবার কি তবে বোন ময়দানে নামতে চলেছেন? যুক্তিশাস্ত্রের নানান জটিল অঙ্ক কষে অনেকেরই ধারণা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে সম্ভবত বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পিচ তৈরি করছেন শর্মিষ্ঠা।
মনমোহন সিংয়ের মৃত্যুর পর থেকেই নতুন করে শর্মিষ্ঠা তোপ দাগছেন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তাঁর মূল নিশানা প্রধানত গান্ধী পরিবারের দিকে। কংগ্রেসের রীতি অনুযায়ী কোনও বড় নেতার মৃত্যুর পরেই ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করতে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ডাকা হয়। কিন্তু, শর্মিষ্ঠার অভিযোগ, তাঁর বাবার মৃত্যুতে কোনও সিডব্লুসি বৈঠক ডাকা হয়নি। শর্মিষ্ঠা একইসঙ্গে রাহুল গান্ধীর 'ভক্ত চেলা'দের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। যারা একসময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রক সামলানো, দেশের জটিল পরিস্থিতিতে সমস্যার সমাধান করা 'চাণক্য' প্রণবকে সঙ্ঘী বলে বিদ্রুপ করতেও ছাড়েনি।
নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত তৃতীয় বর্ষ সঙ্ঘ শিক্ষাবর্গের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে ভাষণ দিয়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে, ২০১৮ সালে সংসদে কংগ্রেস সাংসদ হিসেবে রাহুল গান্ধী আলিঙ্গন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। এসব কারণে ১০ নম্বর জনপথের নির্দেশে কংগ্রেসের একশ্রেণির নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গ সরসঙ্ঘের যোগ নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন। শর্মিষ্ঠা বলেছেন, রাহুলের ভক্ত চেলারা যারা একদিন আমার বাবাকে সঙ্ঘী বলতেন, আমি তাঁদের বলছি, কই আপনারা একবার প্রশ্ন করে দেখুন তো কেন তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সংসদে জড়িয়ে ধরেছিলেন? ইনি সেই রাহুল গান্ধী যাঁর মা মোদীকে মওত কা সওদাগর বলেছিলেন। তাঁদের যুক্তি অনুসারে তো রাহুলকে তাঁর সহযোগী হিসেবে দেখা উচিত, এক্সবার্তায় লিখেছেন শর্মিষ্ঠা।
আরও একটি পোস্টে শর্মিষ্ঠা লিখেছেন, এইসব দুষ্ট মূর্খ, দালালদের সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেসকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলার জন্য রাহুল গান্ধী আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই। এখন আপনার 'নফরত কি দুকানদারদের' আমাকে গালমন্দ করার জন্য ছেড়ে দিন। আমি অভিশাপ দিই! প্রসঙ্গত, এবারেই প্রথম নয়, এর আগেও শর্মিষ্ঠার বিজেপিতে যোগদানের জল্পনা উসকে উঠেছিল। গত ১৫ জানুয়ারি প্রণববাবুকে নিয়ে তাঁর লেখা স্মৃতিকথা প্রণব মাই ফাদার...বইটি মোদীকে দিতে গিয়েছিলেন শর্মিষ্ঠা। কিন্তু, সেই জল্পনায় তিনি তখনই জল ঢেলে দেন।
এখন আবার ঘনঘন রাহুল গান্ধীকে তাক করতে থাকায় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনুমান, দিল্লি বিধানসভা ভোটের আগে সেই জমি নতুন করে তৈরি হতে চলেছে। তাঁদের যুক্তি প্রথমত, প্রণব মুখোপাধ্যায় ভিন্ন শর্মিষ্ঠার ভিন্ন কোনও রাজনৈতিক অস্তিত্ব নেই। বহু নেতানেত্রীর পরবর্তী প্রজন্ম রাজনীতিতে এসে সফল হয়েছেন, যেমন সাম্প্রতিক উদাহরণ হলেন সুষমা স্বরাজ কন্যা বাঁশরী স্বরাজ। তাই শর্মিষ্ঠাও চাইছেন সফল হবেন কিংবা সাফল্যের সম্ভাবনা সবথেকে বেশি এমন দলে নাম লেখাতে। সেই হিসাবে শাসকদলের দিকে ভিড়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার সুসময় হল নির্বাচন। তাই দিল্লি বিধানসভা ভোটের আগেই সে সম্ভাবনার দরজা খুললেও খুলতে পারে। কারণ, শর্মিষ্ঠা দীর্ঘদিনের দিল্লিবাসী। দিল্লির মানুষের কাছে বেশ পরিচিত মুখ। কারণ, তাঁর পরিচয় তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কন্যা। রাজনৈতিক ঘরানায় বড় হয়েছেন। জনতার দরবারে যেতে হলে বাবার নামই তাঁর রাজনৈতিক বিশাল পুঁজি।
তৃতীয়ত, শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়কে দলে পেলে অনেক দিক থেকে লাভবান হবে বিজেপিও। যার মধ্যে প্রথম ও প্রধান কারণ হল, কংগ্রেসের প্রাক্তন এক স্তম্ভ, যিনি ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রিয় পাত্র ছিলেন, সেই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নাম ভাঙিয়ে ভোট আদায়ে সমর্থ হবে দল। দিল্লির রাজনীতিতে কংগ্রেস এবং আম আদমি পার্টিকে সবক শেখাতে শর্মিষ্ঠা বিজেপির আস্তিনের তাস হতে পারেন। আরও একটি কারণ, কংগ্রেস ঘরানার একজনকে রাহুলের দলের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারলে, নৈতিকভাবে সেটা দেশের প্রাচীনতম দলের পক্ষে লজ্জার হয়ে উঠতে পারে। শর্মিষ্ঠা যদি তাঁর বিরুদ্ধে অন্যায়-অবিচার নিয়ে প্রচার করেন কিংবা ভোট চাইতে চান তা কংগ্রেসের পক্ষে সম্মানজনক হবে না। সব মিলিয়ে বড় দাঁওপ্যাচের মধ্য দিয়ে ঘোরাফেরা করছে শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়ের রাজনীতিতে যোগদানের আদৌ কোনও সম্ভাবনা আছে কিনা! থাকলে তিনি দিল্লি বিধানসভা ভোটের আগেই বিজেপি শিবিরে ভিড়তে চলেছেন কিনা!