
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 3 April 2025 13:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বৃহস্পতিবার থেকে থাইল্যান্ডের (Thailand) রাজধানী ব্যাঙ্ককে (Bangkok) শুরু হচ্ছে বিসমসটেক (BIMSTEC) ভুক্ত দেশগুলির সম্মেলন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Prime Minister of India Narendra Modi) সম্মেলনে যোগ দিতে ব্যাঙ্কক পৌঁছে গিয়েছেন। আগামীকাল শুক্রবার ব্যাঙ্কক থেকে তিনি কলম্বো উড়ে যাবেন। তিন সফরে শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka) যাবেন মোদী যে দেশটি প্রথম থেকেই বিমসটেকের সদস্য। এছাড়া ব্যাঙ্ককে এবারে বিমসটেক সম্মেলনের আয়োজক দেশ তাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা।
ভারত এই আঞ্চলিক সহযোগিতার মঞ্চটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ব্যাঙ্ককের সম্মেলনেও ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সাইডলাইনে একাধিক আলোচনাচক্রের ব্যবস্থা করেছে। থাকছে প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও।
৩৯ বছর আগে ১৯৮৫ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল আঞ্চলিক সহযোগিতার মঞ্চ সার্কের (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-SAARC) । সার্কের তুলনায় বিমসটেক নবীন মঞ্চ। কিন্তু ভারত বিগত কয়েক বছর ধরে বিমসটেক-কেই পাখির চোখ করেছে। যদিও দুই মঞ্চের উদ্দেশ্য অভিন্ন, সদস্য দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত করে যৌথ উন্নয়ন। সার্কের ক্ষেত্রে বাড়তি বিচার্য হল আঞ্চলিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা, যা বিমসটেকের মূল এজেন্ডা নয়। তবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমন বিমসটেকের বিচার্য বিষয়গুলির মধ্যে আছে।
বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং তাইল্যান্ডকে নিয়ে প্রথমে ১৯৯৭ সালে গঠিত হয়েছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র BIST-EC (দেশগুলির নামের আদ্যক্ষর) । ওই বছরই মায়ানমার ওই মঞ্চের সদস্য হওয়ার পর সংগঠনটির নাম কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে হয় BIMST-EC। পরবর্তীকালে ভুটান ও নেপাল সদস্য হওয়ার নাম বদলে করা হয় BISMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical & Economic Cooperation) বা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বহুমুখি কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ।
বিমসটেক-এর সদস্য তাইল্যান্ড ও মায়ানমার সার্কের সদস্য নয়। আবার সার্কের সদস্য পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ সদস্য নয় বিমসটেকের। এই মঞ্চ নিয়ে ভারতের বাড়তি আগ্রহের কারণ মূলত দুটি। এক. পাকিস্তান না থাকায় এই মঞ্চে ভারত অনেক বেশি স্বস্তিতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে পারছে। দুই. বিমসটেক ভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে বোঝাপড়ার কারণে ভারত সরকারের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ বা পূর্বমুখী তৎপরতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুবিধা হচ্ছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান থাকাতেই ভারত সার্ক নিয়ে আর আগ্রহী নয়। ২০১৬-তে উরিতে পাকিস্তানি জঙ্গি হামলার পর ইসলামাবাদে সার্কের শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করে নয়া দিল্লি। ভারত বয়কট করায় যোগ দেয়নি বাংলাদেশ-সহ বেশ কিছু সদস্য দেশ। সেই থেকে কাঠমান্ডুতে সার্কের প্রধান কার্যালয় বা সচিবালয় একপ্রকার অকেজো হয়ে আছে। নিয়ম করে শুধু অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাফ গেমস ও সাফ ফুটবল।
বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর একাধিকবার বলেছেন, ‘দিনে বন্ধুত্ব, রাতে সন্ত্রাসের নীতি চলতে পারে না। পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা বন্ধুত্ব নাকি শত্রুতা, কোনটা চায়।’ সেই থেকে দুই দেশের মুখে দেখাদেখি একপ্রকার বন্ধ। বন্ধ ক্রিকেট টিমের সফর। সদ্য অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে যোগ দিতে ভারত পাকিস্তানে যায়নি। একমাত্র আন্তর্জাতিক মঞ্চের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা এক অপরের দেশে যাচ্ছেন। যেমন গত বছর বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইসলামাবাদ গিয়েছিলেন এসসিও সম্মেলনে যোগ দিতে। অন্যদিকে, আগের বছর গোয়ায় এসেছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী বিলাবল ভুট্টো।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত বছর বাংলাদেশে পালাবদলের পর সার্ক নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বারে বাসে সার্কের পুনরুজ্জীবনের কথা বলা শুরু করেছেন। বলাইবাহুল্য, ভারতের উপর চাপ সৃষ্টিই এর লক্ষ্য। গত সোমবার বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে ফোন করেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। ইদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের ফাঁকেও সার্কের পুনরুজ্জীবন নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা হয়। সম্প্রতি ওমানে ভারত মহাসাগরীয় সহযোগিতার মঞ্চের সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তোহিদ হোসেন এবং ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের একাম্ত বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেও তোহিদ হোসেন সার্কের পুনরুজ্জীবনের প্রসঙ্গ পাড়েন। কিন্তু জয়শঙ্কর জানিয়ে দেন পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে জঙ্গি সন্ত্রাস বন্ধ না করা পর্যন্ত ভারত সার্কের ব্যাপারে আগ্রহী নয়।
এবারের বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন এমন সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বিশ্বের বহু দেশ ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে আছে। বিমসটেক ভুক্ত বেশিরভাগ দেশের উপরই মার্কিন শুল্ক চেপেছে। এই পরিস্থিতিতে এই গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি নিজেদের বাজারে একে অপরের পণ্য প্রবেশের সুযোগ করে দিলে সকলেই উপকৃত হতে পারে। বলাইবাহুল্য এই ক্ষেত্রে ভারতের বিপুল বাজার বাকিদের জন্য অনেক বেশি লাভদায়ক হতে পারে। বিমসটেটের পরবর্তী চেয়ারম্যান হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। বাংলাদেশের হাতে এই মঞ্চের সভাপতিত্বের ভার গেলেও মার্কিন শুল্ক নীতির কারণে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলির ভারত নির্ভরতা আরও বেড়ে গেল বলেই মনে করা হচ্ছে।