সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইতিহাস ও পুরাতত্ত্ববিদরা এখন এটা নিয়েই চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন।

বিষ্ণুমূর্তি সংক্রান্ত মামলাটি খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব দফতরের (ASI) এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে। গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 19 September 2025 11:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মধ্যপ্রদেশের মন্দির শহর তথা পুরাশিল্পের তীর্থক্ষেত্র খাজুরাহোর মন্দিরের বিষ্ণুমূর্তির মাথা ভাঙা হয়েছিল? নাকি শিল্পী এই মূর্তি শেষপর্যন্ত সম্পূর্ণ করতে পারেননি? সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইতিহাস ও পুরাতত্ত্ববিদরা এখন এটা নিয়েই চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন।
বিষ্ণুমূর্তি সংক্রান্ত মামলাটি খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব দফতরের (ASI) এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে। সেই সময় প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাই আবেদনকারীকে বলেন, জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্যই মামলাটি করা হয়েছে। আপনি যদি বিষ্ণুভক্ত হন, তবে প্রার্থনা করুন, মূর্তি নিজেই তার ব্যবস্থা করে নেবে! এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। যদিও বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, তাঁর মন্তব্য ভুলভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং তিনি সব ধর্মকেই সমানভাবে শ্রদ্ধা করেন।
খাজুরাহোর প্রতিটি মন্দিরের প্রস্তর ভাস্কর্য শিল্প সারা দুনিয়ায় কদর কেড়ে নেয়। বছরের প্রতিটি দিন খাজুরাহো মন্দিরগাত্রের শিল্পকলা ছবিতে গেঁথে রাখতে ও পেন্সিল-তুলিতে ফুটিয়ে তুলতে দুনিয়াজোড়া শিল্পী ও প্রশিক্ষার্থীরা আসেন। খাজুরাহোতেই এমন একটি মন্দির আছে যার নাম জাভেরি মন্দির। এখন ভগবান বিষ্ণুর সেই মুণ্ডহীন মূর্তিই দেশজুড়ে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। কারণ, আবেদনকারী তাঁর মামলায় মুসলিম আগ্রাসনের সময় এই মূর্তির মাথা কেটে ফেলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করে বর্তমান বিগ্রহটি সংস্কারের দাবি তুলেছিলেন।
তাই মন্দিরের বিষ্ণুমূর্তির সত্যিই মাথা ধ্বংস করা হয়েছিল বিদেশি আগ্রাসনে নাকি এটা এরকমই অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে, তা নিয়ে জটিল প্রশ্ন খাড়া হয়েছে। বিষ্ণু মূর্তিটির হাত, পা এবং অন্যান্য অংশ অবিকৃত থাকলেও কেবল সেটা মুণ্ডহীন রয়েছে। মূর্তিটি নাগারা স্থাপত্যশৈলীর অন্তর্গত। যার বয়স আনুমানিক পঞ্চম শতাব্দী। বর্তমানে পুরো জায়গাটি ইউনেস্কোর সংরক্ষিত এলাকা। এছাড়াও আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে, তা হল মূর্তিটি মধ্যপ্রদেশে কীভাবে ও কেন পাওয়া গিয়েছে?
মূর্তিটির মুণ্ড না থাকার পিছনে অসংখ্য যুক্তি রয়েছে। ভোপালের হামিদিয়া আর্টস অ্যান্ড কমার্স কলেজের সহকারী অধ্যাপক শিবম শর্মার মতে, একটি মত হল, বিদেশি আগ্রাসনের সময় মূর্তিটির মাথা ভাঙা হয়েছে। যেমনটা ভারতের অন্য মন্দিরের ক্ষেত্রে হয়েছে। হিন্দি একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, আর একটি মত হল, মূর্তিটি কখনও সম্পূর্ণ করাই হয়নি। ভাস্কর সম্ভবত অসম্পূর্ণ অবস্থায় মূর্তিটি রেখে দিয়েছিলেন। যদিও এই দাবিগুলির পিছনে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য সদুত্তর নেই। তবে স্থানীয়দের মতে, মূর্তিটি বাইরের লোকেরা ভেঙে দিয়ে গিয়েছে। কারণ, শরীরের বাকি অংশ অবিকৃত থাকলেও কেবল মাথা ভাঙার কারণে প্রচলিত মত এরকমই, বলেন শর্মা।
তবে শর্মার যুক্তি, দেশে এমন অনেক মূর্তি আছে, যেগুলি অসম্পূর্ণ অবস্থায় ছিল। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যেমন- নেমাওয়ার। নর্মদা নদীতীরে পাহাড়ের মাথায় চান্ডেলা শৈলীর এই মন্দিরের গর্ভগৃহ কোনওদিন তৈরিই হয়নি। ভোপালের ভোজেশ্বর মন্দির। যেখানে একটি বিশাল শিবলিঙ্গ রয়েছে। বহুবার এই মন্দির নির্মাণের কাজ শেষ করতে চেয়েও তা হয়নি। জাভেরির মতো মন্দিরকেও সংরক্ষণ করা হয়েছে এর উৎস কোন রাজ্য তা না ভেবেই।
তিনি আরও বলেন, হতে পারে যে এদেশে মুসলিম আগ্রাসনের পর বহু মন্দির ও বিগ্রহ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। কিন্তু, খাজুরাহোতেও যদি তা হতো, তাহলে এখানকার বাকি মন্দিরগুলি আস্ত থাকত না। খাজুরাহো জায়গাটি বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। যেখানে মহম্মদ গজনি ও মহম্মদ ঘোরি আক্রমণ করেছিলেন। এদিকে চান্দেলা সাম্রাজ্য যারা এখানকার অধিকাংশ মন্দির নির্মাণ করেছে, সেটা দশম-একাদশ শতাব্দীর ঘটনা। এই সাম্রাজ্য রক্ষার যথেষ্ট শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল। রাজধানী কালিঞ্জর দুর্গের অবস্থান এতটা উঁচুতে ছিল যে, যা দখল করা প্রায় অসম্ভব। কথিত আছে গজনি চান্দেলা শাসকের সঙ্গে আপস করে নেন।
পুরাতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও সর্ব আর্কিওলজি সলিউশনের প্রতিষ্ঠাতা শিবাজি ঐতিহাসিক গবেষণার উপর জোর দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণা প্রচলিত যে, মুসলিম আগ্রাসন মানেই তা মুঘলদের কাজ। কিন্তু, মুঘলরা এদেশে পা রেখেছিল ১৫২৬ সালে। কিন্তু, তারও ৩০০ বছর আগে থেকে ভারতে মুসলিম শাসকরা ছিল। অধিকাংশ মন্দিরই ভাঙা হয়েছে মুঘলরা আসার আগেই। বিশেষ করে ত্রয়োদশ থেকে ষষ্ঠদশ শতকের মধ্যে।
ইতিহাস বলছে, গজনির আক্রমণ একাদশ শতকে হয়েছিল, কিন্তু খাজুরাহো আক্রান্ত হয়নি। আল বারুনির গ্রন্থেই এই কথা লেখা রয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরে আরও একটি বড় হামলা হয়। হামলাকারী ছিলেন সিকান্দর লোধি। সেটা পঞ্চদশ শতাব্দীতে। তাহলেও খাজুরাহো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ঘন জঙ্গলের ভিতরে। যতদিন না অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ অফিসার টিএস বার্ট জমি জরিপ করতে করতে খাজুরাহোর রহস্য উন্মোচন করেন। ফলে, এটাই একমাত্র প্রশ্ন যে তাহলে কেন কেবলমাত্র জাভেরি মন্দিরই মুসলিম আগ্রাসনের শিকার হবে?