
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 6 February 2025 11:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দক্ষিণ আমেরিকাগামী সুদীর্ঘ বিমান সফর, ভাঙাচোরা নৌকায় প্রাণ হাতে নিয়ে সমুদ্রযাত্রা, এবড়োখেবড়ো উঁচুনিচু পাহাড়ি পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটা, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তের অন্ধকার গারদে বন্দি থাকা। এত কষ্টের সময় কাটিয়েও শেষ পর্যন্ত মার্কিন সেনার বিমানে হাতকড়া পরে দেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন। এভাবেই সাতপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে আমেরিকার সুখবিলাসের জীবনের হাতছানির স্বপ্ন কোতল হয়ে গেল ফিরে আসা ভারতীয়দের।
পাঞ্জাবের হোশিয়ারপুর জেলার তাহলি গ্রামের বাসিন্দা হরবিন্দর সিং। এক দালালকে তিনি ৪২ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন, আমেরিকায় কর্ম-ভিসা করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু, একেবারে শেষ মুহূর্তে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ভিসা মেলেনি। তারপরেই হরবিন্দরকে দিল্লি থেকে কাতারগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তিনি পৌঁছান ব্রাজিলে। হরবিন্দর বলেন, ব্রাজিলে পৌঁছে তাঁকে বলা হয় পেরুতে যেতে হবে। কিন্তু, পেরু যাওয়ার কোনও বিমান না থাকায় গাড়ি করে তাঁকে কলম্বিয়া যেতে হয়। এবং সেখান থেকে পানামা।
পানামা সীমান্ত থেকে হরবিন্দর হাঁটা শুরু করেন কারণ জলপথে যাওয়ার কোনও জাহাজ সেখানে ছিল না। দীর্ঘ হাঁটার পরে তাঁদের একটি ছোট নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। তাতে করে জীবন হাতে নিয়ে তাঁরা পৌঁছান মেক্সিকো সীমান্তে। চারঘণ্টা গভীর সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে তাঁদের নৌকাটি ডুবে যায় এবং একজন মারা যান। আরেকজন মারা গিয়েছিলেন পানামার জঙ্গলে। এই দীর্ঘ সময় তাঁদের কাটাতে হয়েছে দিনে কোনওমতে একমুঠো করে ভাত খেয়ে।
দারাপুর গ্রামের সুখপাল সিং বলেন, ১৫ ঘণ্টা সমুদ্রপাড়ি এবং পাহাড়ি পথে ৪০-৪৫ কিমি হাঁটা সহ্য করতে হয়েছে। পথে কেউ যদি অসুস্থ হয়েছে, তাঁদের মৃত্যুর মুখে ঠেলেই এগিয়ে চলতে হয়েছে। পথে এরকম মরে থাকতে অসংখ্য দেহ আমরাও দেখেছি। কিন্তু, শেষেও জলন্ধরের বাসিন্দা সুখপালকে মেক্সিকোয় গ্রেফতার হতে হয়েছে অনুপ্রবেশের অপরাধে। ঠিক যে সময় তিনি আমেরিকার সীমান্ত পেরতে যাচ্ছেন, তখনই তিনি গ্রেফতার হন।
সুখপাল জানান, গ্রেফতারের পর তাঁদের অন্ধকার গারদে ১৪ দিন রেখে দেওয়া হয়। সেই গারদ থেকে সূর্যও দেখা যায় না। সেখানে অনেক পাঞ্জাবি যুবক, পরিবার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বন্দি ছিল। এখন তিনি অন্যদের উদ্দেশে বলেছেন, এভাবে কেউ যেন আমেরিকায় যাওয়ার চেষ্টা না করেন। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় এঁদের অনেকেই ভিটেমাটি বন্ধক দিয়ে রওনা দিয়েছিলেন। অনেকেই বিরাট পরিমাণ সুদ দিয়ে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। এখন সর্বস্বান্ত হয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে।
তাই তাঁদের পরিবার এখন দালালদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন। হরবিন্দরের স্ত্রী কুলজিন্দর কৌর বলেন, আমরা ঘটিবাটি সব বেচে দিয়েছি। চড়া হারে সুদে লক্ষ লক্ষ টাকা ধার করেছি। আমাদের ঘাড়ে এখন সেই বোঝা জগদ্দলের মতো চেপে বসেছে। কাপুরথালার গুরপ্রিত সিংয়ের পরিবার বাড়ি বন্ধক রেখে ধার করেছেন। ফতেগড় সাহিবের যশবিন্দর সিংয়ে পরিবার ৫০ লক্ষ টাকা মহাজনের কাছ থেকে ধার করেছেন। এখন পাঞ্জাবের সেইসব পরিবারে শুধুই কান্নার হাহাকার ভেসে আসছে। ঘরে ডলারের বৃষ্টি হওয়া তো দূরঅস্ত, কানাকড়িও নেই, যা দিয়ে দুবেলা দুমুঠো খেয়েপরে বাঁচা যায়।