
সুনীল কানুগোলু ও প্রশান্ত কিশোর (ফাইল ছবি)
শেষ আপডেট: 17 April 2024 15:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় রাজনীতিতে দুই দশক আগেও মনে করা হতো ভোট আবেগের উপর ভর করে হয়। বিজ্ঞানের এখানে কোনও স্থান নেই। ভোট করানোটা একটা শিল্প। নেতানেত্রীদের প্রতিশ্রুতি, আমদরবারে তাঁদের জনপ্রিয়তা, প্রভাব-প্রতিপত্তি সর্বোপরি অর্থ ও রাষ্ট্রিক ক্ষমতার উপর নির্ভর করেই ভোটে জেতা যায়। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সেই সব ধারণার আমূল পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। শুধু ভাষণেই আর চিঁড়ে ভিজছে না ভারতবাসীর। তাই হেঁসেলে ঢুকে তাঁদের 'মন কি বাত' শুনে রসায়নের টেস্টটিউবে সেঁকে নিংড়ে বের করা হচ্ছে কৌশল। আর সে কারণেই জন্ম হয় ভোটকুশলীদের প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি। এই কোম্পানিরাই এখন এক-একটি রাজনৈতিক দলের সোনার কাঠি-রুপোর কাঠি নিয়ন্ত্রণ করে।
এক্সেল শিটস, পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনস, টার্গেটেড কনটেন্ট শেয়ারিং, সমীক্ষা, প্রযুক্তি এবং সীমাহীন তথ্য, এসব শব্দ কিছুকাল আগেও অপরিচিত ছিল দেশীয় রাজনীতিকদের কাছে। স্বাধীনতার পর থেকে বেশ কয়েক বছর কংগ্রেসের প্রতি অন্ধ ভক্তি-বিশ্বাসে মানুষ একচেটিয়া ভোট দিয়েছেন কংগ্রেসকে। তারপর কংগ্রেস বিরোধী হাওয়া ওঠার সময় আবেগতাড়িত ভারত ঢেলে ভোট দিয়েছে জনতা দল এবং সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখানো কমিউনিস্টদের। সেই মোহ জমিয়ে বসার আগেই ফের গাইবাছুরে ফিরে গিয়েছেন আমজনতা। এমনকী ইন্দিরা গান্ধী নিধনের পরের ভোটে সহানুভূতির ঝড়ে বিরোধী সব দলকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন সদ্য মাতৃহারা রাজীব গান্ধী।
সে ছিল একদিন। এখন রাজনৈতিক যুদ্ধকৌশলীদের ছাড়া ভোট বৈতরণী উতরানো প্রায় অসম্ভব বলে বিশ্বাস করে শাসক-বিরোধী সব শিবির। আর সে কারণেই এই দুর্বলতাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিজ্ঞানভিত্তিক আস্ত একটা ইন্ডাস্ট্রি। জেতার কৌশল বাতলে দেওয়া সাজঘরে বসে থাকা এইসব ভোটকুশলীদের তুলির টানেই এখন নির্ভরশীল ছোট থেকে বড় সব নেতা।
রাজনৈতিক পরামর্শদাতাদের এই উঠোনে বিষয়টি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন প্রশান্ত কিশোর। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে এবং তারও আগে গুজরাতে বিধানসভা ভোটে নরেন্দ্র মোদীর জয়ের মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। গোড়ার দিকে ২০১৩ সালে সিটিজেন্স ফর অ্যাকান্টেবল গভর্ন্যান্স নামে একটি সংস্থা, পরে ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আইপ্যাক গড়ে তোলেন তিনি।
২০১৪ সালে ব্র্যান্ড মোদী ধারণা গড়ে তুলতে চায়ে পে চর্চার মতো নয়া জনসংযোগ ধারণা গড়ে তোলেন। এর সঙ্গে স্ট্যাচু অফ ইউনিটি আন্দোলন এবং মোদীকে বিকাশপুরুষ হিসেবে উপস্থাপিত করতে থ্রিডি হলোগ্রাম প্রচার। বিজেপি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি দলের নির্বাচনী রণকৌশল রূপায়ণ করেছেন প্রশান্ত কিশোর। তার মধ্যে বাংলার তৃণমূল কংগ্রেস অন্যতম।
এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রশান্ত কিশোরের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন সুনীল কানুগোলু। যিনি বিজেপির হয়ে বিভিন্ন বিধানসভা ভোটে কাজ করেছেন। বর্তমানে কংগ্রেসের কৌশল রূপায়ণের কাজ করছেন। কর্নাটকে কংগ্রেসের বিপুল ভোটে জয়ের অন্যতম কাপ্তান ছিলেন কানুগোলু। রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রাও তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত।
আইআইএম ব্যাঙ্গালোরে ফাইনাল প্রজেক্টের কাজ করতে করতেই এই পেশায় চলে আসেন পার্থপ্রতিম দাস। ২০১৩ সালে কর্নাটক বিধানসভা ভোটে তিনি অজয় সিংয়ের নেপথ্য সেনাপতি ছিলেন। সে বছর বিজেপি বিধায়ককে হারিয়ে দেন অজয় সিং। ২০১৩ সালের নভেম্বরে তিনি অরিন্দম মান্নার সঙ্গে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা চাণক্য গড়ে তোলেন। ২০১৮ সালেও তিনি অজয় সিংয়ের চক্রব্যুহ তৈরি করে দেন এবং জেতেন অজয়।
২০০৯ সালে সোশাল মিডিয়া ভোটারের কাছে একটি নতুন মাধ্যম হিসেবে আসে। তার আগে লালকৃষ্ণ আদবানি কিংবা মুলায়ম সিং যাদবের মতো নেতাদের হেঁটে দেশ চষে বেড়াতে হতো। নতুন প্রজন্মের নেতারা সেসবের ধার ধারেন না। তাই মানুষের মন বুঝতে জনতার দরবারে নয়, অঙ্কের খাতায় কাজ মেটাতে হচ্ছে।
ওয়াররুম স্ট্র্যাটেজিসের মালিক তুষার পাঞ্চাল বলেন, রাজনৈতিক উপদেষ্টার কাজ কোনও নতুন ব্যাপার নয়। কিন্তু আগে এই কাজটি হতো অত্যন্ত গোপনে। তাঁর মতে, প্রশান্ত কিশোরের প্রচারের জন্য এখন সকলে প্রকাশ্যে এসে গিয়েছেন। আগে আমরা সবাই পর্দার আড়ালে থাকতাম। এখন সকলেই চলতি কা নাম গাড়ির সওয়ারি হতে চাইছে। প্রচারের আলোয় থাকতে চাইছে।