ভরা মরশুমের যে সময়ে নৈনিতাল শহরে যানজট লেগে থাকে, সেই সময়টায় রাস্তা ফাঁকা। গাড়িঘোড়া নেই।

আশ্চর্য হলেও সত্যি যে এবছর নৈনিতালে পর্যটকের চিহ্নমাত্র নেই।
শেষ আপডেট: 28 May 2025 13:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাশ্মীরের পহলগামের মতোই এবছর পর্যটন ব্যবসায় আকাল লেগেছে উত্তরাখণ্ডের নৈনিতালেও। ভরা মরশুমের যে সময়ে নৈনিতাল শহরে যানজট লেগে থাকে, সেই সময়টায় রাস্তা ফাঁকা। গাড়িঘোড়া নেই। পার্কিং লট খাঁ-খাঁ করছে। মে-জুন মাসে নৈনিতালে পর্যটকদের ভিড় সামাল দিতে ঠাঁইনাড়া হয়ে যেতে হয় স্থানীয়দের। ঝরঝর করে আয়ের সঞ্চয় জমা হয় ঘরে ঘরে। অথচ, আশ্চর্য হলেও সত্যি যে এবছর নৈনিতালে পর্যটকের চিহ্নমাত্র নেই। কেন এই দশা নৈনিতালের?
নৈনিতাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দিগ্বিজয় সিং বিস্ত এনডিটিভিকে বলেন, হোটেল ও রিসর্ট বুকিংয়ে বিশাল পতন ঘটেছে এ বছর। গত মাসে ৯০ শতাংশ কম বুকিং হয়েছিল। এমনকী জুন মাসেরও বুকিং অনবরত বাতিল হয়ে যাচ্ছে। নয়া অতিথিদের পায়ের ধুলো পড়ছে না। আগের বছরেও অবস্থা এরকম ছিল না, বলেন তিনি।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হোটেল মালিক, গাড়ি চালক সংগঠন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, প্রাকৃতিক হ্রদের জেলা বলে ব্রিটিশ আমল থেকে বিখ্যাত নৈনিতালের উপর থেখে এবার ভ্রমণার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বেশ কয়েকটি কারণে।
৩৫ বছর হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক মালিক বলেন, তাঁর আস্তানাতেও এবছর ৭০-৮০ শতাংশ বুকিং কমেছে। তাঁর মতে, ভ্রমণার্থীরা নৈনিতাল ছেড়ে পাশেই ভীমতাল, মুক্তেশ্বর ও অন্যান্য জায়গায় থাকছেন। স্থানীয় ট্যাক্সি চালক অমৃত বলেন, ১০ বছর ধরে এই শহরে গাড়ি চালাচ্ছি। মাসখানেক ধরে ৫০ শতাংশ যাত্রীও হয়নি। বছরে যা আয় হয়, তার ৮০ শতাংশই উঠে আসে মে-জুন মাসে। ফলে এবছর বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল, বলেন অমৃত। কিন্তু, এসবের কারণ কী? খোঁজ নিয়ে জানা গেল বেশ কয়েকটি কারণে পরিযায়ীরা এই মরশুমে মুখ ফিরিয়েছেন নৈনিতাল থেকে।
পহলগাম হামলা
গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহলগামে জঙ্গিহানার পর থেকেই উত্তর ভারতের পর্যটনে প্রভাব পড়তে থাকে। এই ঘটনার পর থেকেই ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষ শুরু হয়। যুদ্ধ বাধার আশঙ্কায় অনেকেই উত্তর ভারত ভ্রমণ বাতিল করে দেন। বিস্তের মতে, শুধু উত্তরাখণ্ড নয়, গোটা দেশের পর্যটন ব্যবসাই মার খেয়েছে এই ঘটনায়।

নৈনিতালে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা
গত ১ মে নৈনিতালে ১২ বছরের এক নাবালিকাকে ৬০ বছরের এক বৃদ্ধ যৌন হেনস্তা করার অভিযোগে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। শহর জুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ, মারামারি বেধে যায়। পুলিশ এই ঘটনায় ওসমান নামে এক ঠিকাদারকে গ্রেফতার করে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ প্রোগ্রাম বাতিল করেন।
প্রশাসনিক গাফিলতি
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাধারণ মত হল, পর্যটকদের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা জানে না এখানকার প্রশাসন। পর্যটকদের নানান সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব না দিলে তাঁরা কেন পা রাখবেন শহরে? প্রশাসনের একগুঁয়েমি হল, ট্যুরিস্টদের নিজের গাড়ি নিয়ে ঢোকায় মানা রয়েছে। যাঁরা নিজের গাড়িতে আসতে চান, তাঁদের শহর থেকে ১০ কিমি দূরে গাড়ি রেখে আসতে হবে। সরকারি পার্কিং এরিয়ায় দিনপ্রতি ভাড়া ১৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এক ব্যবসায়ীর দাবি, এ কারণেই পুলিশ নৈনিতাল ঢোকার মুখেই পর্যটকদের মারাত্মক যানজটের ভয় দেখিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কারণ, পার্কিং চার্জ বেড়ে যাওয়ায় বহু লোক রাস্তার ধারেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে চলে যাচ্ছেন।

টোল ট্যাক্স বৃদ্ধি
সম্প্রতি উত্তরাখণ্ড সরকার ব্যাপক হারে টোল ট্যাক্স বৃদ্ধি করেছে। এর উপর পরিবেশ কর নামে নয়া ব্যবস্থায় নৈনিতাল ঢোকার মুখে বড়াপাথর এবং ফাঁসি ঘান্ডেরা টোলপ্লাজায় তা আদায় করা হয়। চারচাকা প্রতি ৫০০ টাকা এবং দুচাকার যানের জন্য ৫০ টাকা করে প্রবেশমূল্য নেওয়া হয়। হাইকোর্টের নির্দেশে নৈনিতাল পুরসভা এই কর আদায় করে থাকে। এ ব্যাপারে নৈনিতাল জেলাশাসকের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, টোল ট্যাক্স হচ্ছে ১১০ টাকা, পার্কিং চার্জ ৫০০ টাকা দিনপ্রতি এবং লেক ব্রিজ ট্যাক্স ১১০ টাকা। সে কারণে আমরা সকলকে শহর থেকে কয়েক কিমি দূরে গাড়ি রাখার অনুরোধ জানাই।