ছাব্বিশের ভোটের আগে এই মসজিদ রাজনীতিতে যে যখন হাওয়া উষ্ণ তখন সন্ধান করা যাক, মোঘল সম্রাট হুমায়ুন ভারতে কোনও মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন না।

গ্রাফিক্স দ্য ওয়াল।
শেষ আপডেট: 6 December 2025 18:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলা তথা জাতীয় রাজনীতিতে রাতারাতি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir)। শনিবার পূর্ব ঘোষণা মতো বেলডাঙায় একটি মসজিদের (Babri Masjid) শিলান্যাস করেছেন তিনি। ছাব্বিশের ভোটের (West Bengal Election 2025) আগে এই মসজিদ রাজনীতিতে যে যখন হাওয়া উষ্ণ তখন সন্ধান করা যাক, মোঘল সম্রাট হুমায়ুন ভারতে কোনও মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন না।
উত্তর ভারতে দুটি মসজিদ হুমায়ুন মসজিদ (Humayun Mosque) নামে পরিচিত। একটি আগ্রায়। অন্যটি রয়েছে দিল্লির উপকন্ঠে হরিয়ানার ফতেহাবাদ জেলায়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আগ্রার মসজিদটি নামে হুমায়ুন মসজিদ (Fatehabad Mosque) বা কাচপুরা মসজিদ নামে পরিচিত হলেও, এটা মোঘল সম্রাটই বানিয়েছিলেন কিনা তার স্পষ্ট কোনও তথ্য নেই। তবে হরিয়ানা পর্যটনের দাবি, ফতেহাবাদের মসজিদটি হুমায়ুনেরই বানানো। পানিপথের যুদ্ধে শের শাহর কাছে পরাস্ত হওয়ার পর হুমায়ুন এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
ফতেহাবাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হুমায়ুনের এই মসজিদ। এটি ১৬শ শতকের মোঘল স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। সম্রাট হুমায়ুনের শাসনকালে নির্মিত এই মসজিদ শুধু উপাসনার স্থানই নয়, বরং মোঘল নকশা, কারুকার্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ গঠনের এক মহিমান্বিত দলিল।
স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী
হুমায়ুনের মসজিদের গঠনে মোঘল স্থাপত্যের সব পরিচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্যই মিলবে—লাল বেলেপাথরের দেওয়াল, গম্বুজ, সূক্ষ্ম নকশা ও খোদাই করা কারুকাজ। বিস্তৃত আঙিনা জুড়ে রয়েছে খিলানবেষ্টিত করিডর, আর কেন্দ্রে বৃহৎ নামাজঘর, যেখানে সুদৃশ্য ক্যালিগ্রাফি ও ফুলেল নকশা মুগ্ধ করে চোখ।
মসজিদের পশ্চিম প্রান্তে লখৌরি ইটের এক প্রাচীরের মধ্যে সযত্নে রক্ষিত রয়েছে মনোরম মিহরাব। পারসিক স্থাপত্যশৈলীর ছোঁয়ায় তৈরি এই ছোট কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি ভারতে মোঘল শাসনের সূচনার অন্যতম স্মারক হিসেবে ধরা হয়। শুক্রবারের নামাজে এখানে একসঙ্গে হাজারেরও বেশি মানুষ সমবেত হতে পারেন।
নির্মাণ ইতিহাস
হরিয়ানা পর্যটনের মতে, এই মসজিদ নির্মাণে সময় লেগেছে প্রায় তিন দশক—১৫২৬ থেকে ১৫৫৬ সাল পর্যন্ত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি নির্মিত হয়েছে ফিরোজ শাহ তুঘলকের প্রতিষ্ঠিত একটি ‘লাট’—অর্থাৎ প্রাচীন স্তম্ভ—কে কেন্দ্র করে। সেই স্তম্ভের উপস্থিতি এই মসজিদকে আরও ঐতিহাসিক মাত্রা দিয়েছে।
লাট কি মসজিদ: ফতেহাবাদের আরেক ঐতিহ্য
ফতেহাবাদে হুমায়ুন মসজিদ থেকে কিছু দূরে তোহানা রোডে রয়েছে লাট কি মসজিদ, যা ১৪শ শতকে ফিরোজ শাহ তুঘলক নির্মাণ করেন। হিন্দু ও ইসলামি স্থাপত্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই মসজিদের প্রধান আকর্ষণ হলো প্রায় ১৩ মিটার উঁচু লোহার স্তম্ভ। ধারণা করা হয় এটি সূর্যঘড়ি কিংবা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিমাপের কাজে ব্যবহৃত হতো। স্তম্ভে আরবি ভাষায় উৎকীর্ণ রয়েছে কয়েকটি শিলালিপি, যা এর উৎস ও উদ্দেশ্য জানান দেয়।
কীভাবে পৌঁছাবেন
ফতেহাবাদকে সড়ক ও রেলপথে ভারতের বিভিন্ন বড় শহরের সঙ্গে ভালোভাবে যুক্ত করেছে। নিকটতম বিমানবন্দর আগ্রা প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে। আগ্রা থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে সহজেই ফতেহাবাদ যাওয়া যায়। ফতেহাবাদ রেলওয়ে স্টেশন থেকেও স্থানীয় অটোরিকশা ও ট্যাক্সিতে মসজিদে পৌঁছানো যায়।
ঘোরার জন্য সবচেয়ে ভালো সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ—শীতের সময়টা হুমায়ুনের মসজিদ দেখার জন্য উপযুক্ত। এই সময়ে আবহাওয়া মনোরম থাকে, সকাল বা বিকেলের দিকে ভিড়ও তুলনামূলক কম পাওয়া যায়।
ফতেহাবাদের এই দুই ঐতিহাসিক মসজিদ—হুমায়ুনের মসজিদ ও লাট কি মসজিদ—একদিকে যেমন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে, অন্যদিকে মোঘল ও তুঘলকি যুগের স্থাপত্যশৈলীর অসাধারণ বিবর্তনকে সামনে আনে। ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে এগুলি নিঃসন্দেহে এক অনন্য গন্তব্য।
