
তাহাউর রানা ও ডেভিড হেডলি।
শেষ আপডেট: 10 April 2025 11:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাহাউর রানার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তাঁরই শৈশবের বন্ধু ডেভিড কোলম্যান হেডলি। তাতেই খুলে যায়, ২০০৮-এর মুম্বই জঙ্গি হামলার নেপথ্যে থাকা মূল চক্রীর মুখোশ। হেডলি আমেরিকা থেকে একটি বিশেষ আদালতের সামনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেন এ বিষয়ে।
২৬/১১-র মূল ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম ছিলেন ডেভিড হেডলি নিজেও। জানা যায়, তিনিই ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে নজরদারি করেছিলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী টার্গেট চিহ্নিত করেছিলেন। ভারতের বিশেষ সরকারি আইনজীবী উজ্জ্বল নিকম ও ডিফেন্স আইনজীবী ওয়াহাব খানের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই তিনি ফাঁস করে দেন তাহাওর রানার ভূমিকাটি কতটা গভীর ছিল।
হেডলি স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি রানার অনুমতি নিয়েই মুম্বইয়ে একটি অফিস খুলেছিলেন, টি আসলে তাঁর গোয়েন্দা কার্যকলাপের সামনে আড়াল হিসেবে রাখা থাকত। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থার (NIA) চার্জশিট অনুসারে, তাহাউর রানা সমস্তরকম আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা করেছিলেন হেডলি এবং অন্যান্যদের।
যদিও তাহাউর রানা ২৬/১১-র ঘটনায় আমেরিকার আদালতে দোষী সাব্যস্ত হননি, তবে লস্কর-ই-তইবার সঙ্গে সংযোগের জন্য তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ডেনমার্কের একটি পত্রিকায় এক ধর্মগুরুকে নিয়ে কার্টুন ছাপা নিয়ে সেই পত্রিকার বিরুদ্ধে হামলার ষড়যন্ত্রেও যুক্ত ছিলেন তিনি। সেই মামলার শুনানিতেই হেডলির সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক সামনে আসে।
ডেভিড হেডলি তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, তিনি ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে পাঁচবার লস্করের ট্রেনিং ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের শেষ দিকে তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয় ভারতে গিয়ে নজরদারি করতে। পরবর্তী তিন বছরে পাঁচবার সেই নজরদারি করেছিলেন তিনি। ২০০৬ সালে হেডলি ও দুই লস্কর সদস্য মিলে ঠিক করেন, মুম্বইয়ে একটি ইমিগ্রেশন অফিস খোলা হবে, যেটি আসলে হেডলির গোয়েন্দা কাজের সামনে ঢাল হিসেবে দেখানো হবে।
তিনি আরও বলেন, তিনি তখন রানার সঙ্গে দেখা করতে শিকাগো যান এবং নিজের ‘মিশন’-এর কথা জানান। এরপরই রানা মুম্বইয়ে 'First World Immigration Services'-এর একটি শাখা খোলার অনুমতি দেন। সেই সংস্থার পক্ষ থেকে এক ব্যক্তিকে নির্দেশও দেন, যাতে হেডলির জন্য উপযুক্ত নথিপত্র তৈরি করা যায়। এমনকি ভিসা পেতে কীভাবে এগোতে হবে, সেই পরামর্শও দেন।
উজ্জ্বল নিকম যখন আদালতে হেডলিকে জিজ্ঞাসা করেন, তখন উঠে আসে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। হেডলি বলেন, তিনি ২০০৮ সালের হামলার আগে আটবার এবং পরে একবার ভারতে আসেন। মুম্বই শহরের বিভিন্ন স্থানের নজরদারি করতে তিনি বন্দরে নৌভ্রমণও করেছিলেন এবং নিজের পরিচয় গোপন রাখতে বলিউড তারকাদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব করেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার মাস দুয়েক আগে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে, মুম্বইয়ে হামলার চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। এরপর নভেম্বরেই ১০ জন জঙ্গি শহরে ঢুকে ভয়াবহ হামলা চালায়।
ডেভিড হেডলি বলেন, তিনি পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ISI-এর দুই অফিসার, মেজর আলি ও মেজর ইকবালের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁর কথায়, ওই অফিসাররাই তাঁকে লস্কর সদস্য সাজিদ মিরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সাজিদ মির ছিলেন হেডলির ‘হ্যান্ডলার’। তিনি জানান, লস্করের শীর্ষ নেতা হাফিজ সইদ ও জাকি-উর-রহমান লখভির অধীনেই তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
FBI-র বিবৃতিতেও এই তথ্যগুলোর উল্লেখ ছিল, যা ভারতীয় আদালতে হেডলি নিজের মুখে আবারও বলেন। তাঁর সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছিল আবু জুন্দাল ওরফে জাবিউদ্দিন আনসারির মামলার সময়। অভিযোগ অনুযায়ী, করাচির একটি কন্ট্রোল রুম থেকে ২৬/১১ হামলার সময় সে-ই টেররিস্টদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। এমনকি জঙ্গিদের হিন্দি শেখানোর দায়িত্বও ছিল তার।
ভারতীয় গোয়েন্দারা দাবি করেছেন, মুম্বইয়ে হামলার সময় হামলাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হ্যান্ডলারদের মধ্যে একটি কণ্ঠস্বর ছিল, যার উচ্চারণে ভারতীয় টান মিলেছিল। সেই কণ্ঠস্বরটিই ছিল জুন্দালের।
দাউদ সৈয়দ গিলানি অর্থাৎ ডেভিড হেডলি, বর্তমানে আমেরিকার এক জেলে ৩৫ বছরের সাজা কাটাচ্ছেন। ভারত সরকার তাঁকে ফেরত আনার দাবি জানালেও, মার্কিন প্রসিকিউটর জন জে. লুলেজিয়ান আদালতে বলেন, হেডলি দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পুরোপুরি সহযোগিতা করেছেন। তাই চুক্তি অনুযায়ী তাঁকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। তবে রানার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। কারণ তিনি দোষ স্বীকার করেননি, বরং লুকোচুরি করেছেন।