
তাহাউর রানা।
শেষ আপডেট: 13 April 2025 14:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০০৮ সালের মুম্বই সন্ত্রাস হামলার অন্যতম মূল ষড়যন্ত্রকারী তহাউর হুসেন রানাকে ভারত প্রত্যর্পণ করার পর ফের সামনে এসেছে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর ভূমিকা এবং দুই রহস্যময় ব্যক্তির নাম। মেজর ইকবাল ও মেজর সমীর আলি।
কানাডিয়ান-পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী তহাউর রানা এখন এনআইএ হেফাজতে তিহাড়ে বন্দি। বহু বছরের আইনি লড়াইয়ের পর ১০ এপ্রিল তাঁকে আমেরিকা থেকে ভারতে আনা হয়। এবার তাঁকে জেরা করে উঠে আসছে বহু পুরনো ও গোপন তথ্য।
জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA)-র সূত্র অনুযায়ী, রানা কীভাবে মেজর ইকবাল ও সমীর আলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং হামলার আগে তাঁদের মধ্যে কোনও সমন্বয় হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে চলছে জোরদার জিজ্ঞাসাবাদ।
২০১৮ সালের একটি পিটিআই রিপোর্ট অনুসারে, মেজর ইকবালকে শনাক্ত করা হয়েছিল একজন কর্মরত আইএসআই অফিসার হিসেবে। তিনি সরাসরি ডেভিড হেডলিকে টাকাপয়সা জোগাতেন, কাজের নির্দেশ দিতেন এবং তিনিই হেডলিকে নজরদারির দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
২০০৮ সালের হামলার আগে হেডলি যেসব রেইকি মিশন চালান, তার সমস্তটাই মেজর ইকবালের পরিকল্পনায় ও তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয় বলে জানা গেছে। ২০১০ সালে মৃত্যুদণ্ড এড়াতে গোটা ঘটনা নিয়ে নিজের স্বীকারোক্তি জানান হেডলি। ২০১১ সালের এক সাক্ষ্যতে তিনি বলেন, 'চৌধুরি খান' নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ২০টিরও বেশি ইমেল বিনিময় হয়েছিল। মেজর ইকবালের ছদ্মনামই ছিল এই চৌধুরি খান।
এই ইমেলগুলির মধ্যে ২০০৮-এর একটি ইমেলে শিবসেনার তৎকালীন সদস্য রাজারাম রেগেকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও উল্লিখিত ছিল। যদিও রাজারাম রেগে পরে বলেছিলেন, 'হেডলি সেনা ভবনের বাইরে একবার দেখা করেন আমার সঙ্গে, ভিতরে ঢোকারও অনুরোধ করেন, তা আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করি। আমাদের দেখা হয়েছিল মাত্র দু'মিনিটের জন্য।'
আরেকটি ইমেলে হেডলিকে বলা হয়েছিল, প্রজেক্ট (পড়ুন হামলা) ও নজরদারির সরঞ্জামের আপডেট যেন মেজর ইকবালকে জানানো হয়।
আমেরিকায় রুজু হওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, 'মেজর ইকবাল পাকিস্তানের বাসিন্দা এবং লস্কর-ই-তইবার তরফে নিযুক্ত ছিলেন গোটা হামলার পরিকল্পনা ও অর্থায়নে।' তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও হত্যা-সহ ছ'টি অভিযোগ আনা হয়। তবে আইএসআই-এর নাম সেখানে সরাসরি লেখা হয়নি।
মেজর ইকবাল যদি এই হামলার স্থপতি হন, মেজর সমীর আলি ছিলেন হামলার অধিনায়ক। ২০১২ সালে দিল্লি পুলিশের হাতে ধৃত ২৬/১১ হামলার ‘হ্যান্ডলার’ জাবিউদ্দিন আনসারি ওরফে আবু জুনদাল জানান, সমীর আলি করাচির মিলিটারি ঘাঁটি মালির ক্যান্টনমেন্টে লস্কর-ই-তইবার কন্ট্রোল রুম থেকে হামলাটি সরাসরি তদারকি করছিলেন।
জুনদালের বয়ান অনুসারে, সমীর আলি সেই সময় লস্কর কমান্ডার জাকিউর রেহমান লখভিকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন।
ইন্টারপোলের রেড নোটিস অনুযায়ী, সমীর আলির জন্ম ১৯৬৬ সালে, লাহোরে। তিনি উর্দু, হিন্দি ও ইংরেজিতে দক্ষ। ভারতের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের মামলায় তিনি পলাতক। তবে পাকিস্তান বরাবরই এই লোকটির অস্তিত্বই অস্বীকার করে এসেছে এবং তাঁকে 'কল্পিত চরিত্র' বলেই দাবি করেছে।
২০১২ সালের ইকনমিক টাইমসের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, হামলার কয়েক সপ্তাহ পর পাকিস্তানের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা এফআইএ করাচির সেই কন্ট্রোল রুমে অভিযান চালিয়ে সমস্ত প্রমাণ ধ্বংস করে। এরপর কয়েক মাসের মধ্যেই তারা লখভিকে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মুজাফফরাবাদের ‘বাইতুল মুজাহিদিন’ শিবির থেকে গ্রেফতার করে। তবে সেই সময় আবু জুনদাল ও আবু কাহাফা (যিনি হামলাকারীদের কমব্যাট ট্রেনার ছিলেন) পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
তহাউর রানার প্রত্যর্পণ যেন কেবল একজন অপরাধীর বিচার নয়, বহুবছরের এক অপরাধ জালের ভিতরে প্রবেশের চাবিকাঠি। ভারতীয় তদন্তকারীরা এখন তাঁর কাছ থেকেই বের করতে চাইছেন বহু বছর ধরে লুকিয়ে থাকা সেইসব তথ্য, যা প্রমাণ করতে পারে ২৬/১১ শুধুই এক বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী হামলা, এটি ছিল রাষ্ট্র-প্ররোচিত যুদ্ধেরই প্রতিচ্ছবি।