
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 4 April 2025 15:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সংসদের দুই কক্ষে পাশ হয়ে যাওয়ার পর বহু চর্চিত-বিতর্কিত ওয়াকফ বিলের বর্তমান গন্তব্য রাষ্ট্রপতি ভবন। সেখানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সিল-স্বাক্ষর হলেই তা আইনে পরিণত হয়ে যাবে। এই বিল পাশকে দেশের এক বৈপ্লবিক মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে ওয়াকফ সংশোধনী বিল নিয়ে এত বিতর্কের কারণ কী? কেনই বা শাসকদল বিজেপি এই বিলকে আইনে কার্যকর করতে চাইছে? আর কেনই বা বিরোধী জোট সর্বশক্তি দিয়ে এই বিলের বিরোধিতা করে চলেছে। আইনসভায় পাশ হয়ে যাওয়ার পরেও বিচারসভায় বিলকে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর হয়েছে কংগ্রেস এবং ডিএমকে। কী উদ্দেশ্য রয়েছে এর পিছনে?
প্রথম বিষয় হচ্ছে- ওয়াকফ হল দানের সম্পত্তি। এই সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভাল করে একটি কমিটি। যেখানে সুষ্ঠুভাবে কর্তৃত্ব ও অপব্যবহার রোখার বিভিন্ন আইনবিধি রয়েছে, যা শুরু হয়েছে ১৯১৩ সাল থেকে শুরু করা একটি আইনের মাধ্যমে। সংসদে বিতর্ক চলাকালীন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রক ওয়াকফ ইতিহাস নিয়ে একটি বিস্তারিত তথ্য পেশ করেছে। যেখানে ওয়াকফের মূল সম্পত্তি ছাড়াও কোন রাজ্যে কত পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে তার তথ্য দেওয়া আছে। যে তালিকা অনুসারে দেখা যাচ্ছে যে ওয়াকফ সম্পত্তির সংখ্যার শীর্ষে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ এবং দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ।
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত দেওয়া পরিসংখ্যানে দেশে মোট ৮.৭২ লক্ষ নথিভুক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। জমির হিসেবে যার পরিমাণ ৩৮ লক্ষ একর। ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম অফ ইন্ডিয়া পোর্টালেই এই ডেটা রয়েছে। এর মধ্যে ৪.০২টি ওয়াকফ সম্পত্তিতে ব্যবহারকারীরা রয়েছে। নিজস্ব মালিকানায় রয়েছে ৯,২৭৯টি এবং মাত্র ১০৮৩টি দলিল রয়েছে সংশ্লিষ্ট ওয়াকফ হিসেবে।
রাজ্যভিত্তিক হিসেবে উত্তরপ্রদেশ (সুন্নি)-র হাতে রয়েছে সর্বোচ্চ পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি। উত্তরপ্রদেশে ২ লক্ষ ১৭ হাজারটি ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। যদিও মোট জমির পরিমাণ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। উত্তরপ্রদেশের পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। বাংলায় মোট ৮০ হাজার ৪৮০টি ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে পাঞ্জাব (৭৫,৯৬৫), তামিলনাড়ু (৬৬,০৯২) এবং কর্নাটক (৬২,৮৩০)।
অর্থাৎ, কেন্দ্রের শাসকদলের সঙ্গে বিরোধী জোট শক্তির বিরোধের মূল কারণই হল, ওয়াকফ সম্পত্তির উপর দখলিসত্ত্ব কোন রাজনৈতিক দলের হাতে থাকবে। কারণ ওয়াকফ যতই মুসলিম ধর্মকেন্দ্রিক হোক না কেন, তাতে স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলির প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ থাকেই। সে কারণে দেখা যাচ্ছে, উত্তরপ্রদেশ দীর্ঘদিন শাসন করেছে সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি এবং কংগ্রেস। ফলে তাদের আমলেই বহু সম্পত্তি ওয়াকফের বলে ঘোষিত হয়েছে। যেখানে এখনও কমবেশি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলির। ফলে বিজেপির এই বিল আইনে পরিণত হলে মুসলিম ও বিরোধী দলগুলির পেটেও হাত পড়তে পারে।
তেমনই পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের পর তিন যুগ সিপিএম শাসনে এবং বর্তমানে বিজেপির ঘোরতর বিরোধী তৃণমূল জমানাতেও ওয়াকফ সম্পত্তির ভবিষ্যৎ প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছে। কারণ, বাংলায় কংগ্রেস, সিপিএমের তিন দশকের রাজত্বের পর বর্তমানে বিজেপির ঘোরতর বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস শাসন ক্ষমতায় রয়েছে। বিশেষত বিরোধীদের মূল ভোটব্যাঙ্কই হল মুসলিম জনসংখ্যা। সে কারণেই উত্তরপ্রদেশ, বাংলার মতোই পাঞ্জাব (আম আদমি পার্টি), তামিলনাড়ু (ডিএমকে) ও কর্নাটক (কংগ্রেস) ওয়াকফ বিলের লাগাতার বিরোধিতা করে চলেছে। অন্যদিকে, বিজেপি এই আইন বলবৎ করে ওয়াকফ সম্পত্তিতে স্বচ্ছতা আনতে পরোক্ষে জমির উপর কবজা নিতে চাইছে।