আয়াপ্পার দর্শনের টানে এ বছরও লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছে শবরীমালার (Sabarimala temple) পাহাড়ি মন্দিরে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় দু’লক্ষ ভক্তের ভিড়ে কার্যত নড়াচড়া করার জায়গা নেই পাহাড়ের চূড়ায়, পাম্বা থেকে সন্নিধানম পর্যন্ত দীর্ঘ সারিতে আটকে রয়েছেন হাজার হাজার তীর্থযাত্রী।(sabarimala news)

শেষ আপডেট: 19 November 2025 17:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেরলের ঘন অরণ্যের বুক চিরে উঠে গিয়েছে এক পর্বত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,২৬০ মিটার উঁচু সেই পাহাড়ের মাথায় বসে রয়েছেন এক ব্রহ্মচারী দেবতা – শ্রীধর্ম শাস্তা, ভক্তদের কাছে তিনি স্বয়ং স্বামী আয়াপ্পা (Lord Ayyappa)। সেই আয়াপ্পার দর্শনের টানে এ বছরও লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছে শবরীমালার (Sabarimala temple) পাহাড়ি মন্দিরে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় দু’লক্ষ ভক্তের ভিড়ে কার্যত নড়াচড়া করার জায়গা নেই পাহাড়ের চূড়ায়, পাম্বা থেকে সন্নিধানম পর্যন্ত দীর্ঘ সারিতে আটকে রয়েছেন হাজার হাজার তীর্থযাত্রী।(sabarimala news)
আয়াপ্পা কে? কেন শবরীমালাকে এত ‘জাগ্রত’ ধরা হয় (Sabarimala temple famous for)
শবরীমালার আসল আকর্ষণ কেবল ভিড় বা পাহাড়ি রোমাঞ্চ নয়, মূল শক্তি তার আধ্যাত্মিকতা। মন্দিরটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘শবরীমালা শ্রী ধর্মশাস্তা মন্দির’ – এখানে পূজিত হন ধ্যানমগ্ন ব্রহ্মচারী দেবতা আয়াপ্পা বা ধর্মশাস্তা। পুরাণকথায় তিনি মহাদেব শিব ও বিষ্ণুর মোহিনী অবতারের পুত্র – তাই তাঁকে বলা হয় ‘হরিহরপুত্র’, যিনি শৈব আর বৈষ্ণব ভক্তিকে এক সূত্রে বাঁধেন। কথিত আছে, অসুর বধের জন্যই দেবতারা এই অদ্বিতীয় সন্তানের জন্ম কামনা করেছিলেন। ব্রহ্মার বর ছিল – কেবল শিব ও বিষ্ণুপুত্রই মহিষাসুরকে বধ করতে পারবে। তাই মোহিনীর গর্ভে জন্ম নেন আয়াপ্পা। পরে দানবী মহিষীকে বধ করে তিনি স্থাপন করেন ধর্ম ও ন্যায়বোধের শাসন – সেই ‘ধর্মশাস্তা’রই আসন শবরীমালা পাহাড়ের উপরে রয়েছে।
‘শবরীমালা’ নামের সঙ্গে জুড়ে আছে রামায়ণের ভক্ত শবরীর কাহিনি। বিশ্বাস, এই পর্বত অঞ্চলে শবরী কঠোর সাধনা করেছিলেন এবং রাম-দর্শনের পর এখানেই শাস্তা দেবতা তীব্র তপস্যায় লীন হন। সেই থেকে পাহাড়টি শবরীর সঙ্গে জুড়ে ‘শবরীমালা’ নামে প্রখ্যাত।

৪১ দিনের ব্রত, কালো পোশাক আর ‘স্বামীয়ে শরণম আয়াপ্পা’
শবরীমালার মাহাত্ম্য বলা হয় মূলত ‘ব্রতচারী যাত্রা’র জন্য। অধিকাংশ পুরুষ ভক্তই মন্দির দর্শনের আগে ৪১ দিন কঠোর ব্রত পালন করেন – এই সময় মদ-মাংস, তামাক, যৌনসম্পর্ক, জাঁকজমক সবকিছু থেকে দূরে থেকে তারা সাদা বা কালো পোশাক পরে, গলায় ধারণ করেন রুদ্রাক্ষ বা তুলসীমালা। প্রতিদিন ভোরে ও রাতে প্রার্থনা, ভক্তি সঙ্গীত আর একটাই জপ – “স্বামীয়ে শরণম আয়াপ্পা।” ব্রতের শেষে কাঁধে জোড়া বস্তা–যুক্ত ‘ইরমুডি কেট্টু’ নিয়ে ভক্তরা পাহাড়ে ওঠেন। সেই ইরমুডির মধ্যেই থাকে নৈবেদ্যের ঘি–ভরা নারকেল, অন্ন, প্রণামার্ঘ্য প্রভৃতি। প্রথা হল – ইরমুডি কেট্টু ছাড়া কেউই মন্দিরের পবিত্র ১৮ সিঁড়ি (পথিনেত্তম পাড়ি) ভাঙতে পারবেন না।
১৮ ধাপের গূঢ় তাৎপর্য
শবরীমালার ১৮টি সোনালি সিঁড়ি নিয়ে ভক্তি ও দর্শনের এক বিশাল জগৎ গড়ে উঠেছে। এই সিঁড়ি এখন ‘পঞ্চধাতু’ দিয়ে মোড়া। বিশ্বাস, প্রথম পাঁচ ধাপ মানুষের পাঁচ ইন্দ্রিয়ের প্রতীক – দেখা, শোনা, গন্ধ, স্বাদ আর স্পর্শ। পরের আট ধাপ মানুষের আটটি নীচ প্রবৃত্তি বা ‘অষ্টরাগ’ – কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাত্সর্য, ঈর্ষা, দম্ভ। তার পরের তিন ধাপ তিনটি গুণ – সত্ত্ব, রজ, তম। আর শেষ দু’টি ধাপ বিদ্যা ও অবিদ্যার প্রতীক, অর্থাৎ অজ্ঞতা জয় করে জ্ঞানে প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ ভক্ত যখন ব্রতপালন করে এক এক ধাপ ভাঙেন, প্রতীকী অর্থে তিনি নিজের ইন্দ্রিয়দেবীকে নিয়ন্ত্রণ করেন, কাম-ক্রোধকে জয় করেন, গুণগতভাবে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন। ১৮ ধাপ অতিক্রম মানে আধ্যাত্মিক উত্তরণ – ভক্ত আর ভগবানের মধ্যে দূরত্ব কমে গিয়ে ‘তত্ত্বমসি’, তুমি–ই সেই চেতনার অংশ – এই উপলব্ধি। এই গূঢ় সাধনার পথ হিসেবেই শবরীমালাকে বহু ভক্ত ‘জাগ্রতক্ষেত্র’ বলে মানেন।

মণ্ডলম থেকে মকরভিলাক্কু – এক দীর্ঘ উৎসব
শবরীমালা মন্দির সারাবছর খোলা থাকে না। মূল ভিড় থাকে প্রতি বছর কার্তিক-মাঘ মাসের মাঝের সময়টুকুতে – মণ্ডলম (প্রায় মধ্য নভেম্বরে শুরু) থেকে মকরসংক্রান্তি (১৪ জানুয়ারি) পর্যন্ত। এই সময়টাকেই ধরা হয় ‘মণ্ডলম-মকরভিলাক্কু’ যাত্রা–মৌসুম হিসেবে। শেষ দিনে মকরসংক্রান্তির সূর্যাস্তের পর পাহাড়ের ওপরে ‘মকরজ্যোতি’ বা ‘দিব্য আলো’ দেখা যাওয়া এবং বিশেষ আরাধনা – ভক্তদের কাছে যার মাহাত্ম্য অপরিসীম।
শবরীমালায় মহিলাদের প্রবেশ ও সামাজিক বিতর্ক
দীর্ঘদিন ধরে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সি ঋতুমতী নারীদের শবরীমালায় প্রবেশে প্রথাগত নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে সকল বয়সের মহিলাদের প্রবেশাধিকার স্বীকৃত দিলেও তা ঘিরে কেরলে তীব্র আন্দোলন ও সামাজিক সংঘাত দেখা দেয়। পরে মামলাটি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হয়েছে; বাস্তবে এখনো বহু ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রতিরোধের কারণে মহিলাদের প্রবেশ সীমিত থাকে। এই বিতর্কের মধ্যেও আয়াপ্পার ‘ব্রহ্মচারীত্ব’ ও ভক্তদের কঠোর ব্রতই শবরীমালার তীর্থযাত্রাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
শুধু ধর্ম নয়, অর্থনীতি–সংস্কৃতিরও কেন্দ্র
লক্ষ লক্ষ ভক্তের যাতায়াত ঘিরে শবরীমালা আজ কেরলের আঞ্চলিক অর্থনীতির বড় স্তম্ভ। পরিবহণ, লজিং-বোর্ডিং, ছোট ব্যবসা, খাবারের দোকান – অসংখ্য মানুষ এই মরসুমের উপর নির্ভর করেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্তদের মিলনমেলায় গড়ে ওঠে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক সেতু – তেলুগু, কন্নড়, তামিল, মালয়ালম, এমনকি বাংলাভাষী ভক্তদের অদ্ভুত এক মিলন।তীব্র ভিড়, দুর্ঘটনা, জনরোষ, রাজনীতি– সবকিছুর মাঝেও শবরীমালার আসল আকর্ষণটা অন্য জায়গায়। হাজার হাজার মানুষের চিৎকারে যখন পাহাড় কাঁপে – “স্বামীয়ে শরণম আয়াপ্পা” – তখন প্রত্যেক তীর্থযাত্রীর মাঝেই এক ব্যক্তিগত সাধনা, এক অন্তর্দৃষ্টি কাজ করে। ৪১ দিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ, ১৮ পবিত্র ধাপ, অরণ্যের বুক চিরে অন্ধকার রাত– সব মিলিয়ে শবরীমালার যাত্রা যেন নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে জয় করার এক প্রতীকী পথচলা।
অতিরিক্ত বিধিনিষেধ, তবু ভিড় সামলানো কঠিন
মণ্ডলম–মকরভিলাক্কু মরসুমের শুরু হওয়ায় রবিবার রাত থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত দু’দিনেই প্রায় ২ লক্ষ যাত্রী ঢুকেছেন শবরীমালায়। এত ভিড় সামাল দিতে তিরুবনন্তপুরমের ত্রাভাঙ্কোর দেবস্বম বোর্ড (টিডিবি) ও রাজ্য পুলিশ বেশ কয়েকটি নতুন নিয়ম জারি করেছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দর্শনার্থীর সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হয়েছে ১ লক্ষ। স্পট বুকিং বা হঠাৎ এসে কিউয়ে ঢোকার সুযোগও কমিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ২০ হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে। অনলাইন ভার্চুয়াল কিউয়ের স্লটও সীমিত রাখা হচ্ছে ৭০ হাজারের মধ্যে। টিডিবি–র তরফে জানানো হয়েছে, নির্ধারিত স্লট ছাড়া অন্য দিনে কেউ এলে তাঁকে নীলাক্কলেই আটকে দেওয়া হবে, প্রয়োজনে তাঁকে সেখানে রাত কাটানোর ব্যবস্থাও করবে বোর্ড। ভিড় কমাতে নীলাক্কলে বাড়ানো হয়েছে স্পট বুকিং কাউন্টার, ডিউটিতে থাকছেন অতিরিক্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক। পাহাড়ের উপরে এবং লম্বা সারির মধ্যে ভক্তদের হাতে জল পৌঁছে দিতে বিশেষ টিম তৈরি হয়েছে।
দুর্ঘটনা, মৃত্যু, তবু ‘স্বামী শরণম’
শবরীমালায় ভিড়ের চাপ কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, তার করুণ ছবি ধরা পড়েছে মঙ্গলবার। ৫৮ বছর বয়সি এক মহিলা ভক্ত কোইলান্ডি (কোজিকোড় জেলা) থেকে এসেছিলেন আয়াপ্পার দর্শনে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আচমকাই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান তিনি। পরে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। বোর্ডের প্রেসিডেন্ট কে জয়কুমার জানিয়েছেন, মৃতার দেহ অ্যাম্বুল্যান্সে করে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা করবে টিডিবি। একইদিনে কোট্টায়ম জেলার এরুমেলির কাছে ৩৩ জন তীর্থযাত্রী-সহ কর্ণাটকগামী একটি বাস ওভারটেক করতে গিয়ে উলটে যায়। সৌভাগ্যবশত মাত্র তিনজন সামান্য চোট পান, হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পরই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু দুর্গম খাড়াই রাস্তা, অতিরিক্ত ব্রেক কষা আর বেপরোয়া ওভারটেক – এই ত্রিমূর্তির ফলেই দুর্ঘটনা, জানাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।(The Times of India)
মন্দির চত্বরে ১৮ পবিত্র সিঁড়ির উপর ও পাম্বা–সন্নিধানম পথে এমন ভিড় যে স্বয়ং টিডিবি-প্রেসিডেন্ট নিজেই বলেছেন, এত ‘ম্যাসিভ অ্যান্ড ডেঞ্জারাস ক্রাউড’ তিনি আগে দেখেননি। কোথাও কোথাও নাকি লাইনে ঢুকে পড়ার লড়াই, ধাক্কাধাক্কি। তাই নীলাক্কলে আগে থেকেই ভিড় আটকে দিয়ে ধাপে ধাপে পাম্বা ও সন্নিধানমে তোলা হচ্ছে মানুষকে।
বিরোধী দলনেতা ভি ডি সাথীসন অভিযোগ তুলেছেন, রাজ্য সরকার ও টিডিবি ভক্তদের জন্য ন্যূনতম পানীয় জল, শৌচালয়, নিরাপত্তা – এসবই যথেষ্ট পরিমাণে নিশ্চিত করতে পারেনি। তাঁর দাবি, মডেল কোড অফ কন্ডাক্টের অজুহাতে সরকার যে ‘যথাযথ প্রস্তুতি’ নিতে পারেনি– এই যুক্তি হাস্যকর, কারণ প্রস্তুতি অনেক আগেই শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই ভিড়ের মাঝেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘গ্লোবাল আয়াপ্পা সঙ্গম’ আয়োজন করে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলার অভিযোগও উঠেছে আয়োজকদের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে কেরল হাইকোর্টের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন বিরোধী দলনেতা ও কয়েকজন বিজেপি নেতা।
‘ব্রেন ইটিং’ অ্যামিবা নিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা
গত কয়েক মাসে কেরলে নেগ্লেরিয়া ফাউলেরি নামের ‘ব্রেন ইটিং’ অ্যামিবার সংক্রমণে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ অবস্থায় কর্ণাটক সরকার শবরীমালা–গামী তীর্থযাত্রীদের উদ্দেশ্যে বিশেষ স্বাস্থ্য পরামর্শ জারি করেছে। স্থির বা নোংরা জলে স্নান না করা, নদীতে বা পুকুরে নামলে নাকের জন্য নোজক্লিপ ব্যবহার, আর জলে নামার সাত দিনের মধ্যে যদি জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, বমি বা বিভ্রান্তি দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে ভিড় নিয়ন্ত্রণে যতই বিধিনিষেধই জারি হোক, যত বিতর্কই মাথাচাড়া দিক – শবরীমালার দিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের অদম্য স্রোত থামানো যায় না। ভক্তদের বিশ্বাস, পাহাড়ের মাথায় বসে আছেন ‘জাগ্রত’ আয়াপ্পা – যিনি ব্রত আর ভক্তি দিয়ে কাছে টেনে নেন সবাইকে, আর ক্লান্ত যাত্রাপথ শেষে কানে কানে শোনান একটাই বাণী – ধর্মের পথেই মুক্তি।