পশ্চিমবঙ্গের অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী অজয় মল্লর জীবন পাল্টে দিল মণিপাল হাসপাতালের রোবোটিক স্পাইন সার্জারি। হাঁটাচলা থেকে বাগান—ফিরেছে পুরনো জীবন।

অজয় মল্ল ও ডক্টর এস বিদ্যাধর।
শেষ আপডেট: 28 May 2025 20:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ৮০ বছর বয়সেও স্বনির্ভরতার প্রতিমূর্তি ছিলেন বাংলার বাসিন্দা, অজয় কুমার মল্ল। ইন্ডিয়ান রেলওয়েতে এক উজ্জ্বল কর্মজীবনের স্মৃতি নিয়ে অবসরের দিনগুলোতে তিনি জীবনের প্রতি দারুণ ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই কাটাচ্ছিলেন সময়। কিন্তু দেড় বছর আগে আচমকাই জীবনের মানে যেন বদলে গেল। মধ্য ও নিম্ন পিঠের অসহ্য ব্যথা তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে।
ধীরে ধীরে সেই ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে পায়ে, সঙ্গে দুর্বলতা, অসাড়তা ও সেই সঙ্গে হাঁটার সময়ে পড়ে যাওয়ার ভয়ও ছিল তাঁর। শেষমেশ কয়েক পা হাঁটা পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কলকাতার বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেন তিনি। ওষুধেও মিলছিল না স্বস্তি। শুরুতে অস্ত্রোপচারের কথা একপ্রকার বাদই দিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা।
কিন্তু যখন সমস্যা আরও বাড়তে থাকে, তখন তাঁর মেয়ে-জামাই নতুন সমাধান খুঁজতে শুরু করেন। এক বন্ধুর পরামর্শে তাঁরা যোগাযোগ করেন বেঙ্গালুরুর মণিপাল হাসপাতালের রোবোটিক স্পাইন সার্জারি বিভাগের প্রধান ও চেয়ারম্যান, ডক্টর এস. বিদ্যাধরের সঙ্গে। ওই বন্ধু নিজেও সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন সেখান থেকেই।
হাসপাতালে বিস্তারিত মূল্যায়নের পর অজয়বাবুর ক্ষেত্রে ধরা পড়ে জটিল একটি স্পাইন সমস্যা— ডিজেনারেটিভ ল্যাম্বার স্কোলিওসিস, অর্থাৎ মেরুদণ্ডের পাশে বেঁকে যাওয়া এবং সেই সঙ্গে ছিল ‘ক্যানাল স্টেনোসিস’। অর্থাৎ মেরুদণ্ডের মধ্যবর্তী স্নায়ু পথ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া। এই জটিল সমস্যাগুলির কারণে তাঁর স্নায়ুতে চাপ পড়ছিল এবং সেটাই ব্যথা ও চলাফেরার সমস্যার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অস্ত্রোপচারের আগে।
ডক্টর বিদ্যাধরের নেতৃত্বে সার্জারির ব্যবস্থা করা হয়। যার মধ্যে ছিল স্কোলিওসিস কারেকশন, স্নায়ুর উপর থেকে চাপমুক্ত করা (ডিকমপ্রেশন) এবং ইনস্ট্রুমেন্টেড স্ট্যাবিলাইজেশন, অর্থাৎ অস্তিবন্ধন করে মেরুদণ্ডকে স্থিতিশীল করা। সার্জারির সময় অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিতে, রোবোটিক গাইডেন্সের মাধ্যমে, সিমেন্ট অগমেন্টেশন, দুটি S2 Alar Iliac স্ক্রু এবং পেডিকেল স্ক্রু বসানো হয়।
এত বড় সার্জারির পর তাঁর সুস্থতা ছিল চমকে দেওয়ার মতো। অস্ত্রোপচারের পরের দিনই ধরে ধরে হাঁটতে শুরু করেন অজয়বাবু। এবং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বাড়ি ফিরে যান। আজ তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে হাঁটতে পারছেন। শুধু হাঁটাই নয়, সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামা করা, বাগান পরিচর্যার মতো তাঁর প্রিয় কাজগুলিও আবার শুরু করেছেন। যা একসময় স্বপ্নের মতো মনে হত, তাই আজ বাস্তব।

অস্ত্রোপচারের পরে।
অজয় কুমার মল্লর এই পুনর্জন্মের কাহিনি যেন চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের বার্তা দেয়। রোবোটিক স্পাইন সার্জারির মতো প্রযুক্তি কতটা নিখুঁত ও কার্যকর হতে পারে, তা অজয়বাবুর জীবন বদলে দিয়ে প্রমাণ করল। যেখানে একসময় ছিল যন্ত্রণা আর সীমাবদ্ধতা, সেখানে আজ রয়েছে আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতা ও কর্মচঞ্চল জীবন।