
শেষ আপডেট: 23 January 2024 09:44
অমল সরকার, অযোধ্যা
নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, 'রাম মন্দির শুধু দেব মন্দির নয়, রাষ্ট্র চেতনার মন্দির।' যোগী আদিত্যনাথের কথায়, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জগতে বিশ্বের রাজধানী এবং পূণ্যার্থীদের এক নম্বর গন্তব্য হবে অযোধ্যা।
সোমবার রাম মন্দির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এই দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই লক্ষ্যে অযোধ্যার পরিকাঠামোর আমূল পরিবর্তন শুরু হয়েছে। রামজন্মভূমিতে মাথা ঠেকাতে আসা পূন্যার্থীদের রাত্রিবাসের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করা হচ্ছে অযোধ্যায়।
যোগীর এই মন্তব্যের পর আলোচনা শুরু হয়েছে দেশের প্রথম সারির তীর্থস্থানগুলিতে পূণ্যার্থীর সংখ্যা নিয়ে। সেই হিসেবে দেখা যাচ্ছে বছরে সবচেয়ে বেশি ধর্মপ্রাণ মানুষ ভিড় করেন পাঞ্জাবের স্বর্ণমন্দিরে। সেখানে সাড়ে তিন কোটি মানুষ প্রতি বছরে ভিড় জমান। শিখ ধর্মাবলম্বীদের প্রধান এই তীর্থ ক্ষেত্রে সব ধর্মের মানুষের প্রবেশাধিকার আছে। এছাড়া পাকিস্তান থেকে প্রতি বছর কয়েক হাজার শিখ স্বর্ণ মন্দিরে মাথা ঠেকাতে যান।
ধর্মীয় স্থানে ভিড়ের অঙ্কে দ্বিতীয় স্থানে আছে তিরুপতি মন্দির। দক্ষিণের এই মন্দিরে বছরে আড়াই কোটি ভক্তের ভিড় হয়। সেই তুলনায় বারাণসী বা কাশী যা এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সংসদীয় কেন্দ্র, সেখানে ভিড় তুলনামূলকভাবে কম।
উত্তরপ্রদেশ সরকার সূত্রে জানা যাচ্ছে যোগী আদিত্যনাথ চাইছেন পূণ্যার্থির ভিড়ে অযোধ্যাকে বিশ্বের এক নম্বর স্থানে পৌঁছে দিতে। ভাটিকানে বছরে ৯০ লাখ মানুষ সামিল হন। মক্কায় যান দু কোটি মানুষ। সেখানে যোগীর লক্ষ্য অযোধ্যায় প্রতিবছর অন্তত পাঁচ কোটি মানুষকে টেনে আনা।
অযোধ্যায় ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর। সোমবার সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিমান ছাড়াও বাকি ভিভিআইপিদের ৬০টি চার্টাড বিমান নামে। এতগুলি বিমান ওঠানামা এবং রাখার ব্যবস্থা সেখানে এখনই আছে। রেল স্টেশনটিরও আমল পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে বিশ্বমানের বাস স্ট্যান্ড। অযোধ্যা শহর থেকে ডিজেল চালিত বাস তুলে নিয়ে ইলেকট্রিক বাস চালানো হচ্ছে।
শুধু অযোধ্যা নগরী নয় গোটা জেলা জুড়ে তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিকাঠামো। দেখে মনে হবে যেন নতুন কোনও উপনগরী তৈরি হচ্ছে। প্রাচীন এই শহরের অলিগলিতে কয়েক হাত পর পর বুলডোজার, পে লোডার দাঁড়িয়ে। পুরনো ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভেঙে সরু রাস্তা ৪-৬ লেনের করা হচ্ছে । এখনই বেশকিছু চওড়া রাস্তা তৈরি হয়ে গিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে খবর, রাম মন্দির তৈরির কাজ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১১০টি নতুন হোটেল তৈরি হয়েছে রামজন্মভূমিতে।
আরও ৭০০ হোটেল তৈরির জন্য জমি বরাদ্দ করেছে অযোধ্যা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। হোটেলের জন্য জমি নিয়েছে মার্কিন বহুজাতিক সংস্থা জেডব্লু ম্যারিয়ট, আইটিসি, গ্র্যান্ডের মতো দেশ-বিশ দেশের প্রথম সারির হোটেল সংস্থা। তৈরি হবে পাঁচতারা সাততারা মানের হোটেল।
রামজন্মভূমিতে এখন জমিই সবচেয়ে বেশি মহার্ঘ এবং বিপুল টাকার ব্যবসা চলছে। পুরনো বাড়িঘর কিনে ভেঙে ফেলে তৈরি হচ্ছে হোটেল, শপিং মল, বাজার ইত্যাদি।
পুরনো বাসিন্দাদের অনেকেই ঘরবাড়ি বিক্রি করে দিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
বাতাসে ভাসছে অন্য কথাও। প্রমোটর বাহিনীর প্রবল চাপের মুখেও অনেকে শহর ছাড়ছেন। এই শহরে চার পুরুষের বাস এক পরিবারের প্রবীণ সদস্যের কথায়, অযোধ্যার মাটি এখন সোনা। বাতাসে টাকা উড়ছে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানির রমরমা। বছর দুই আগেও যে শহরে রাত কাটানোর প্রধান উপায় ছিল ধর্মশালা, সেগুলিরও এখন ভোল বদল ঘটেছে। কিছু বিক্রি হয়ে গিয়েছে। কিনে নিয়েছে হোটেল সংস্থা। ফলে রাম মন্দির উদ্বোধনের পর অযোধ্যা এখন নতুন প্রতিযোগিতায় নামতে চলেছে। তা হল, বছরে সবচেয়ে বেশি পর্যটককে রাম জন্মভূমিতে টেনে আনা।
ওয়াকিবহল মহল মহল মনে করছে সময় ধরে পরিকাঠামো তৈরি করা গেলে লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব নয়। কারণ রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে যে উৎসাহ উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে তা আগামী কয়েক বছর ধরে চলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আর তাতে নয়া মাত্রা যোগ করেছে সোমবারের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ। মোদী বলেছেন, দেবতা থেকে দেশ, রাম থেকে রাষ্ট্র। দশ হাজার বছর পরেও মানুষ রাম মন্দিরের কাহিনি মনে রাখবে। সোমবার পাঁচশো বছরের গোলামির যন্ত্রণা শেষে রামলালা অস্থায়ী আস্থানা থেকে স্থায়ী ঘর পেলেন। রাম মন্দির হল রাষ্ট্র মন্দিরের প্রতীক। অনেকেই মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর আবেগ তাড়িত ভাষণ বহু মানুষকে অযোধ্যায় টেনে আনবে।