
ভারত কি ধীরে ধীরে মৃত্যুদণ্ড এড়িয়ে যাচ্ছে?
শেষ আপডেট: 13 February 2025 13:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এই নিয়ে পরপর কয়েক বছর, ভারতে কোনও মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। শেষবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ২০২০ সালে। নির্ভয়া মামলার চার আসামির ফাঁসি হয়েছিল সে বছরে। তার পরে বহু মামলায় ফাঁসির রায় হলেও, একটিও সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।
মৃত্যুদণ্ড বাতিল নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বারবার দাবি উঠলেও, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেনি এখনও। তবে তথ্যমতে, সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টতই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে বাড়তি সংযম দেখাচ্ছে। এর ফলে দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা বাড়ছে। কারণ তাঁরা দণ্ড পেলেও, ফাঁসি হয়নি।
ন্যাশনাল ল ডেলহি ইউনিভার্সিটির ‘প্রোজেক্ট ৩৯এ’ সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট কোনও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেনি। এইসব মামলায় আদালত বরং মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে বিকল্প শাস্তির দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে দিল্লির তিহাড় জেলে পাঁচটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সের একটি সিরিজ, 'ব্ল্যাক ওয়ারেন্ট'-এ এই বিষয়টি তুলেও ধরা হয়েছে।
এর পরে ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভারত মোট ১৬ জন আসামিকে ফাঁসি দিয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হল, আজমল কসাব (২০০৮ মুম্বই হামলার মূলচক্রী), আফজল গুরু (২০০১ সংসদ হামলার মূলচক্রী), ইয়াকুব মেমন (১৯৯৩ মুম্বই বিস্ফোরণের অন্যতম অপরাধী), ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় (কিশোরী হেতাল পারেখকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ফাঁসি)। এর পরে ২০২০ সালের নির্ভয়া-অপরাধীদের কথা আগেই বলা হয়েছে। স্বাধীন ভারতে প্রথমবার একইসঙ্গে চারজনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার ঘটনা ছিল এটিই।
কিন্তু বর্তমানে, সুপ্রিম কোর্টের ধারাবাহিক ফাঁসিবিরোধী অবস্থান প্রশ্ন তুলছে, ভারত কি ধীরে ধীরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার হার কমিয়ে আনছে?
ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতিটি হল, 'গলায় ফাঁসি দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা'। এই পদ্ধতি 'অমানবিক' বা উন্নত ও সভ্য বিচারব্যবস্থার পরিপন্থী-- এই যুক্তিতে বিশ্বের বহু দেশে ফাঁসি বাতিল হয়েছে। যেমন পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়ায় ইতিমধ্যেই মৃত্যুদণ্ড বিলোপ পেয়েছে। তবে আমেরিকা, ইরান, চিন এবং ভারত এখনও ফাঁসির আইনি কাঠামো বজায় রেখেছে।
ভারতে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ২০২০ সালে। নির্ভয়া মামলার চার আসামির ফাঁসি হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলায় বহুবার উল্লেখ করেছে, যে 'বিরলের মধ্যে বিরলতম' অপরাধ হিসেবে এই ঘটনা গণ্য করা হচ্ছে এবং সেইসব ক্ষেত্রেই ফাঁসির সাজা প্রয়োগ করা উচিত।
যদিও সুপ্রিম কোর্টের এমন পর্যবেক্ষণের পরেও, নিম্ন আদালতগুলি এখনও বহু মামলাতেই মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে যাচ্ছে। তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছয় ছ'টি মৃত্যুদণ্ড রদের আর্জি। সেগুলি পর্যালোচনা করে, পাঁচটির ক্ষেত্রে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় আসামিদের এবং এক আসামিকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়।
২০২৪ সালে ট্রায়াল কোর্টে ১৩৯টি মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট একটিও নিশ্চিত করেনি। হাইকোর্টে বহাল রয়েছে ৯টি মৃত্যুদণ্ড, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যা। তবে ৯টি বহাল রাখলেও, ৭৯টি মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে কারাবাস করা হয়েছে, ৪৯ জনকে খালাস করা হয়েছে এবং একটি মামলা ফেরত পাঠানো হয়েছে নিম্ন আদালতে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের শেষে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা ছিল ৫৬৪, যা ২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ সংখ্যা। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪০৪, যা এখন ৪১% বৃদ্ধি পেয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশের আইনে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যার এই চিত্রতে এ কথা স্পষ্ট, যে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেও, কিন্তু হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কমিয়ে দিচ্ছে।
মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণা হলেও, তা কার্যকর করতে চূড়ান্ত ধাপে সুপ্রিম কোর্টের তরফে 'ব্ল্যাক ওয়ারেন্ট' বা মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করা হয়। যখন কোনও বন্দির সমস্ত আইনি পথে আবেদনের সুযোগ ব্যর্থ ও শেষ হয় যায়, তখনই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই নির্দেশ হয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ফাঁসির সাজা হলেও এবং দেশ থেকে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ না হলেও 'ব্ল্যাক ওয়ারেন্ট' জারি কমছে কেন?
বস্তুত ভারতে মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গ সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই বিতর্কিত ছিল। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, 'অত্যন্ত বিরল ও গুরুতর' এবং 'বিরলের মধ্যে বিরলতম' অপরাধেই কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা উচিত।
পাশাপাশি, আদালত পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার (Restorative Justice) পদ্ধতির উপরেও জোর দিচ্ছে। এই পদ্ধতিতে অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়। তাই, যদি একজন আসামির সংশোধনের সম্ভাবনা থাকে, তবে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে তার সাজা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্ট এমনই একটি রায়ে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে বলে, 'যদি সংশোধনের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কম শাস্তি দেওয়া উচিত।'
তবে, আদালত বারেবারে একথা বললেও, দেশের আইনি কাঠামো থেকে মৃত্যুদণ্ড সরিয়ে নেওয়ার জন্য কোনও নীতি এখনও নির্ধারিত হয়নি। তা না হলেও, তথ্য ও তত্ত্বের ভিত্তিতে এ কথা বলাই যায়, এদেশের আইন ব্যবস্থায় ফাঁসির দড়ি ধীরে ধীরে শিথিল হচ্ছে।