তবে বাদুড়ের মধ্যে এই ভাইরাস ভারতের কিছু অংশ ও প্রতিবেশী বাংলাদেশে ঘোরাফেরা করে - এ কথা মাথায় রেখে ভবিষ্যতে আরও সংস্পর্শের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি WHO।

শেষ আপডেট: 30 January 2026 14:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২৫-এর ডিসেম্বর থেকে ভারতে নিপা ভাইরাসের দু’টি সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) শুক্রবার জানাল, দেশ থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এখনও কম (Nipah risk moderate Bengal WHO)। তাই ভ্রমণ বা বাণিজ্যে কোনও নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন নেই।
এক বিবৃতিতে WHO বলেছে, নিপা সংক্রমণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সামলাতে পারবে ভারত, তা আগেই প্রমাণিত। জাতীয় ও রাজ্য হেলথ টিম যৌথভাবে প্রস্তাবিত জনস্বাস্থ্য (public health) ব্যবস্থা কার্যকর করছে। “এই মুহূর্তে মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ার কোনও প্রমাণ নেই,” জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে বাদুড়ের মধ্যে এই ভাইরাস ভারতের কিছু অংশ ও প্রতিবেশী বাংলাদেশে ঘোরাফেরা করে - এ কথা মাথায় রেখে ভবিষ্যতে আরও সংস্পর্শের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি WHO। এদিকে, হংকং, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম এবং নেপাল-সহ একাধিক দেশ কোভিডের সময়কালের মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা আবার শুরু করেছে।
কারা আক্রান্ত?
পশ্চিমবঙ্গে দু’টি নিপা সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ২৫ বছর বয়সি এক মহিলা ও এক পুরুষ নার্স আক্রান্ত হয়েছেন। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাঁদের উপসর্গ দেখা দেয়, দ্রুত স্নায়ু সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়। জানুয়ারির শুরুতেই তাঁদের আইসোলেশনে রাখা হয়।
১১ জানুয়ারি কল্যাণীর এক সরকারি হাসপাতালের ভাইরাল রিসার্চ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি প্রথমে সন্দেহভাজন নিপা সংক্রমণ চিহ্নিত করে। ১৩ জানুয়ারি পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি (NIV) সংক্রমণ নিশ্চিত করে।
২১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পুরুষ রোগী সুস্থতার পথে, তবে মহিলা রোগীর অবস্থা এখনও সংকটজনক।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক মঙ্গলবার জানিয়েছে, আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা সকলের পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে। মন্ত্রকের বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে, নিপা সংক্রমণ নিয়ে জল্পনাভিত্তিক ও ভুল পরিসংখ্যান কিছু মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (NCDC)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র দু’টি নিশ্চিত সংক্রমণই নথিভুক্ত হয়েছে। মানুষ ও সংবাদমাধ্যমকে কেবল সরকারি সূত্রের তথ্যের উপর নির্ভর করার অনুরোধ করা হয়েছে।
নিপা কীভাবে ছড়ায়?
নিপা একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত মারাত্মক ভাইরাস। প্রধানত ফল খাওয়া বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে আসে। মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ সম্ভব হলেও তা সীমিত।
প্রাণীদের মধ্যে বাদুড়, শুয়োর, কুকুর ও ঘোড়ায় এই ভাইরাস থাকতে পারে। দূষিত ফল বা খেজুরের রসের মাধ্যমে সংক্রমণের বহু নজির রয়েছে।
মানুষের শরীরে এই ভাইরাস সাধারণত জ্বর ও মস্তিষ্কে প্রদাহ ঘটায়, যা প্রাণঘাতী হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো দ্রুত ছড়ায় না নিপা। অল্প সময়ে বিপুল সংক্রমণের সম্ভাবনাও কম।
নিপার উপসর্গ কী?
প্রাথমিক উপসর্গ - জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা (খুব নির্দিষ্ট নয়, অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যেতে পারে)। পরবর্তী সময়ে স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেয়, যা তীব্র এনসেফালাইটিসের ইঙ্গিত দেয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর শ্বাসকষ্টও দেখা যায়।
গুরুতর অবস্থায় খিঁচুনি শুরু হতে পারে এবং কয়েক দিনের মধ্যে কোমায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। যারা সুস্থ হয়ে ওঠেন, তাঁদের অধিকাংশই পুরোপুরি সেরে ওঠেন, তবে কারও কারও দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সমস্যা থেকে যেতে পারে।
ভারতে নিপা নতুন নয়
ভারতে নিয়মিতই কিছু কিছু নিপা সংক্রমণ ধরা পড়ে, বিশেষ করে কেরলে, যা বিশ্বে নিপার ক্ষেত্রে উচ্চ-ঝুঁকির অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালে প্রথম বড় প্রাদুর্ভাবের পর সেখানে বহু মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ভারতে নথিভুক্ত সপ্তম প্রাদুর্ভাব এবং পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয়। এর আগে ২০০১ ও ২০০৭ সালে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে নিপা সংক্রমণ দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে বলে WHO জানিয়েছে।
টিকা বা চিকিৎসা আছে?
এই মুহূর্তে নিপার বিরুদ্ধে কোনও অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে গবেষণা চলছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা, যারা কোভিড টিকা তৈরির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, তাঁদের তৈরি একটি সম্ভাব্য টিকাও পরীক্ষাধীন।
সব মিলিয়ে, সতর্কতা জারি থাকলেও WHO-র মূল্যায়ন—পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়, এবং সঠিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ভারত এই প্রাদুর্ভাব সামলাতে সক্ষম।