আজাদ হিন্দ রেডিওর জন্ম
যুদ্ধের শুরুতে জার্মানি ভারত নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি, কারণ ভারত তখনও ব্রিটিশ শাসনের অধীন। কিন্তু নেতাজি তাঁদের বোঝান যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করতে হলে ভারতে প্রচার চালানো জরুরি। এই ভাবনা থেকেই ১৯৪২ সালের ৭ জানুয়ারি বার্লিন থেকে শুরু হয় 'আজাদ হিন্দ রেডিও' বা 'ফ্রি ইন্ডিয়া রেডিও'র সম্প্রচার।
এই রেডিওকে অস্ত্র করেই নেতাজি তাঁর স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দিতে থাকেন ভারতবাসীর ঘরে ঘরে। তাঁর কণ্ঠে গর্জে উঠেছিল সেই রক্ত গরম করা শব্দববন্ধ— 'অন্য জাতির কাছে ব্রিটিশরা সাময়িক শত্রু, কিন্তু ভারতের কাছে তারা চিরশত্রু।' এই বাক্য স্বাধীনতার এত বছর পরেও সত্যি।
বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রতিক্রিয়া
আজাদ হিন্দ রেডিওর সম্প্রচার বিশ্বমঞ্চেও আলোড়ন তোলে। হিটলারের প্রচার সচিব জোসেফ গোয়েবলস মন্তব্য করেন— 'ভারতের হয়ে আমাদের লড়াই আমরা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করলাম।'
এরপর থেকেই অক্ষশক্তির সমস্ত রেডিও স্টেশন থেকে নেতাজির ভাষণ নিয়মিত সম্প্রচারিত হতে থাকে। ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি, তামিল, মারাঠি, পাঞ্জাবি, উর্দু ও পশতু ভাষায় সাপ্তাহিক সংবাদ বুলেটিন প্রচার করা হতো। আজাদ হিন্দ রেডিওর দায়িত্ব ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের দক্ষ স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে।
পরবর্তীতে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বুঝে নেতাজি রেডিওর সদর দফতর সিঙ্গাপুর এবং রেঙ্গুনে স্থানান্তর করেন, যদিও বার্লিন থেকে সম্প্রচারও অব্যাহত ছিল।
সংগ্রামের বার্তা
আজাদ হিন্দ রেডিওর প্রতিটি সম্প্রচার শুরু হতো বাহাদুর শাহ জাফরের সেই দৃপ্ত লাইনে— 'গাজিয়োঁ মে বু রহেগি জব তক ইমান কি, তব তো লন্ডন তক চলেগি তেগ হিন্দুস্তান কি।' যার অর্থ হল, যতদিন ধর্মযোদ্ধাদের মধ্যে বিশ্বাসের সুগন্ধ থাকবে, ততদিন লন্ডন পর্যন্ত ধাওয়া করবে ভারতীয় তরবারি।
নেতাজির ভাষণে তিনি ভারতবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতেন 'কমরেড' সম্বোধনে এবং তাঁর প্রতিটি ভাষণ শেষ হতো গর্জন করে— 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' ও 'আজাদ হিন্দ জিন্দাবাদ।'
আজাদ হিন্দ রেডিওতে প্রচারিত নেতাজির বার্তা ক্রমেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল। তাঁর প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (BBC) মিথ্যা ও বিকৃত খবর প্রচারের জন্য নেতাজি ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন 'ব্লাফ অ্যান্ড ব্লাস্টার করপোরেশন,' আর অল ইন্ডিয়া রেডিওকে নাম দিয়েছিলেন 'অ্যান্টি ইন্ডিয়ান রেডিও।'
স্বাধীনতার আলোর দিশা
১৯৪২ সালের ৩১ অগস্ট নেতাজি আজাদ হিন্দ রেডিও থেকে 'কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট' শীর্ষক ভাষণে দেশবাসীকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান। তিনি পরামর্শ দেন কীভাবে ব্রিটিশদের কৌশলকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে হবে। তাঁর অনুপ্রেরণামূলক স্লোগান—
'নাও অর নেভার' এবং 'ভিকট্রি অর ডেথ'— সারা দেশে আগুনের মত ছড়িয়ে পড়েছিল।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, 'ব্রিটিশরা যখন পিছু হটবে, তখন তারা শেষ মুহূর্তে ভয়াবহ আঘাত হানবে। প্রস্তুত থাকো।' নেতাজির কণ্ঠে ছিল সাহস, আত্মবিশ্বাস আর আশার বার্তা— 'রাতের সবচেয়ে অন্ধকার সময়টিই হয় সূর্যোদয়ের ঠিক আগে। সংগ্রাম চালিয়ে যাও। স্বাধীনতা আমাদের হাতের মুঠোয়।'
সব মিলিয়ে, আজাদ হিন্দ রেডিও শুধু একটি প্রচার মাধ্যম ছিল না। এটি ছিল স্বাধীনতার লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ একটি বিপ্লবী অস্ত্র, যা ভারতবাসীর মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগিয়ে তুলেছিল এবং ব্রিটিশ শাসনের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল।
তথ্যসূত্র: focusnetaji.org, ignca.gov.in