
নেতাজি ও নীরা আর্য
শেষ আপডেট: 23 January 2025 12:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরপ্রদেশের বাগপত জেলার খেকড়ার সভ্রান্ত ব্যবসায়ী শেঠ ছাজ্জুমল। দেশজুড়ে কারবার ছড়ানো। যদিও থাকতেন কলকাতায়। সঙ্গে ছেলে বসন্তকুমার, মেয়ে নীরা আর্য। ইতিহাস বসন্তকুমার কিংবা ছাজ্জুমলকে মনে রাখেনি। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিকথায় স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন নীরা। নেতাজি সুভাষের আদর্শে দীক্ষিত, তাঁর প্রতিষ্ঠিত ঝাঁসি বাহিনীর ‘ক্যাপ্টেন’ এই মহীয়সী নারী দেশকে আজাদ করার বাসনায় ছেড়েছিলেন সমাজ, ছেড়েছিলেন সংসার। এমনকী সুভাষচন্দ্রের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ‘গদ্দারি’র শাস্তি হিসেবে স্বামীকে হত্যা করতেও হাত কাঁপেনি নীরার। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পর যদিও ‘দেশের মাটি’ তাঁর কদর করেনি। নিজভূমে উৎখাত হয়েছিলেন নীরা আর্য। মৃত্যুর পর জোটেনি রাষ্ট্রের তরফে গান স্যালুট। ফুল বিক্রি করে জীবন কাটানো এই বীরাঙ্গনার শেষকৃত্য করেছিলেন এক সাংবাদিক।
ছেলেবেলা থেকেই নীরার জীবন ছিল নাটকীয়তায় মোড়া। ইংরেজি, হিন্দি ও বাংলা তিনটি ভাষা রপ্ত করার পাশাপাশি প্রথাগত বিদ্যাচর্চাতেও আগ্রহ ছিল তাঁর। কিন্তু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উদ্বেল কলকাতায় থাকার সুবাদেই হয়তো ধীরে ধীরে তাঁর বুকে জমতে থাকে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার স্বপ্ন।
কিন্তু কালের লিখন অন্যরকম। তাই হয়তো নিজের স্বপ্নের পথে ইচ্ছেমতো এগোতে পারেননি নীরা। বাবা শেঠ ছাজ্জুমল ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা চিন্তা করে মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। পাত্র শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস। ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পদস্থ অফিসার। আগামি দিনে স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিকল্পনা করছে যে মেয়ে, তাঁকে ঘর করতে হবে ঘোষিত শত্রুপক্ষের প্রতিনিধির সঙ্গে! ফারাকটা শুধু আদর্শগত নয়, অধিকারের, জীবন পরিকল্পনারও বটে! তবু বাবার মুখ চেয়েই সম্ভবত ঘর করতে রাজি হন নীরা। বেশ কিছু বছর দাঁতে দাঁত চিপে রয়ে যান সংসারে।
ঠিক তখনই খবর পান, দাদা বসন্তকুমার বাড়ি ছেড়েছেন। যোগ দিয়েছেন আজাদ হিন্দ ফৌজে। সেই আজাদ হিন্দ, যার সেনানায়ক নেতাজি। নেতাজি সুভাষের আদর্শ, তাঁর বাণীই তো ছেলেবেলা থেকে নীরার রক্তে দোলা তুলেছে! এরপর আর কালক্ষেপ নয়। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন নীরা। যোগ দেন ফৌজে। ফৌজের ঝাঁসি রেজিমেন্টে।
উল্লেখ্য, ১৯৪৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভুত মহিলা স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে এই রেজিমেন্ট গঠিত হয়। উচ্চতর প্রশিক্ষণ চলত বর্মার গহিন জঙ্গলে। ট্রেনিং ক্যাম্প বসানো হয়েছিল সিঙ্গাপুর, ব্যাঙ্কক, রেঙ্গুনে। বীরাঙ্গনাদের শিখতে হত মার্শাল আর্ট থেকে গ্রেনেড ছোড়া। মাইন পাতা থেকে বেয়নেট চালানো। এ ছাড়া মহিলাদের কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল গোয়েন্দা বিভাগ। পুরুষ-মহিলা মিলিয়ে মিশিয়ে সেই বাহিনী তৈরি করেন নেতাজি। মেয়েদের বলা হয়: তাদের ছেলেদের পোশাক পরে, চুল ছোট করে ছেঁটে ছলে-বলে-কৌশলে ঢুকতে হবে ব্রিটিশ অফিসারদের ডেরায়। কখনও বাড়ি, কখনও সেনাছাউনি। আর সেখান থেকে হাতিয়ে আনতে হবে গোপন তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ নথি।
কোনও সন্দেহ নেই, যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। অথচ এই ঝুঁকি নিতেই তো সংসারের সুখশয্যা ছেড়েছিলেন নীরা। তাই তাঁকে মেয়েদের গোয়েন্দা দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন নেতাজি।
কিন্তু এই সময় ঘটে যায় বিপদ। দুর্গা মল্ল গোখরা নামে ওই বিভাগের এক ক্যাডেট ব্রিটিশদের সেনাছাউনিতে ঢুকে ধরা পড়েন। তথ্য হাতে বেরিয়ে আসা হয়ে ওঠে না আর। ধরা পড়ার পর ব্রিটিশ সেনা দুর্গার উপর কথ্য অত্যাচার শুরু করে। প্রাণের কথা চিন্তা না করেই তাঁকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন নীরা আর্য। সঙ্গ নেন সরস্বতী রাজামণি। বৃহন্নলার সাজ ও বেশ ধরে শিবিরে ঢুকে পড়েছিলেন দুই বীরাঙ্গনা। গেয়ে, নেচে, সুরা পরিবেশন করে ব্রিটিশ অফিসারদের আচ্ছন্ন করে রাখেন তাঁরা। আর তারপর সুযোগ বুঝে বন্দিনী দুর্গাকে নিয়ে দেন চম্পট! মুহূর্তে ‘ঝাঁসির রানি’দের ষড়যন্ত্র ধরে ফেলে ব্রিটিশ সেনা। পিছু ধাওয়া করে তারা। গুলি চালায়। পায়ে লাগে সরস্বতীর। একজন আহত। অন্যজন অবসন্ন। দুই সহযোদ্ধাকে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়েন নীরা। তারপর দুর্গার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে উঠে পড়েন গাছের মগডালে। পিছু ধাওয়া করা ব্রিটিশ সেনা সম্ভবত দুঃস্বপ্নেও অনুমান করেনি, নিশুতি রাতে দুর্গম অরণ্যে তিন ভারতীয় কন্যা গাছে উঠে আত্মগোপন করতে পারে।
মিশন শেষে ক্যাম্পে ফিরে এসেছিলেন তিনজনই। অসম সাহসিকতার জন্য তাঁদের প্রত্যেককে পুরস্কৃত করেছিলেন নেতাজি। নেতৃত্বদানের ক্ষমতা বুঝতে পেরে নীরাকে দিয়েছিলেন ‘ক্যাপ্টেনে’র শিরোপা।
বাইরের দুর্যোগের পাশাপাশি ঘরের অন্দরেও ততদিনে জাল পেতেছে শত্রু। স্বামী শ্রীকান্ত খুশিই হয়েছিলেন স্ত্রীর আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগদানের ঘটনায়। তার কারণ, এর ফলে নেতাজির গোপন অনেক তথ্য হাতে আসবে সহজে। ১৯৪৩ সালে বর্মার গভীর জঙ্গল ধরে সফর করছিলেন নেতাজি। চালক চিরবিশ্বস্ত নিজামুদ্দিন। যাকে পরে ‘কর্নেলে’র খেতাব দেবেন তিনি। হঠাৎ দেখা যায় চারিদিক থেকে শত্রুরা ঘিরে ধরেছে। সে যাত্রা নিজের জীবন বিপন্ন করে সুভাষচন্দ্রকে রক্ষা করেছিলেন নিজামুদ্দিন। পরে জানা গিয়েছিল, এই চক্রান্তের মূল চক্রী খোদ নীরার স্বামী শ্রীকান্ত জয়শংকর। পাকা খবর জানতে পেরে নীরার মন থেকে স্বামীর প্রতি সমস্ত অনুরাগ মুছে যায়। শুধু তাই নয়, জন্ম নেয় ক্ষোভ, অপরসীম ক্রোধ। তাই হাতে তুলে নেন ছুরি। আর সেই ছুরিকাঘাতেই নিজের হাতে হত্যা করেন স্বামীকে।
এই খবর সামনে আসার পরই বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির বিপর্যয় ঘটে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় আজাদ হিন্দ বাহিনী। বন্দিনী নীরাকে আনা হয় দিল্লি। লালাকেল্লায় বসে বিচার। যার শেষে নীরাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শোনানো হয়। পাঠানো হয় আন্দামান। সেলুলার জেলে আটকে রাখা হয় নীরাকে। চলে অকথ্য অত্যাচার। কথিত আছে, নেতাজির খবর জানতে চেয়ে ‘ব্রেস্ট রিপার’ দিয়ে নীরার ডান স্তন উপড়ে ফেলেছিল নৃশংস জেলার। তবু দাঁতে দাঁত চিপে রেখেছিলেন নীরা আর্য। একটি বাক্য বলেননি।
আন্দামানে আসার এক বছর বাদে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু নীরার খোঁজ রাখেনি কেউ। অগণন মানুষের ভিড়ে মিশে গেছিলেন তিনি। নাকি মিশে যেতে চেয়েছিলেন? বহু বছর পর হায়দরাবাদের ফলকনুমায় খোঁজ মিলেছিল নীরার। বস্তির এক চালাঘরে থাকতেন। বেচতেন ফুল। তাঁর পরিচয় জানার পর সরকারি তরফে পেনশনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু নাকচ করেন নীরা। একপ্রকার লোকচক্ষুর আড়ালেই মারা যান তিনি (১৯৯৮, ২৬ জুলাই)। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্যও জোটেনি। এক সাংবাদিক চোখের জলে বিদায় দেন নেতাজির ভাবশিষ্যা, বীরাঙ্গনা নীরা আর্যকে।