
মায়াবতী এবং তাঁর ভাইপো আকাশ আনন্দ
শেষ আপডেট: 24 June 2024 08:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভরা ভোটের মরশুমে বহুজন সমাজ পার্টির সুপ্রিমো মায়াবতীর একটি সিদ্ধান্ত ঘিরে উত্তর প্রদেশের রাজনৈতিক মহলে তুমুল শোরগোল শুরু হয়েছিল। তিনি ভাইপো আকাশ আনন্দকে দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। ভোট মিটতে ফের আকাশকে আগের পদে ফিরিয়ে এনেছেন পিসি মায়াবতী। ঘোষণা করেছেন আকাশই দলে তাঁর উত্তরসুরী।
এই ব্যাপারে বিজেপির নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সমাজবাদী পার্টি। তাদের বক্তব্য, বিজেপি সর্বদা সমাজবাদী পার্টির পরিবারতন্ত্র নিয়ে কথা বলে। অথচ মায়াবতী রাজনীতির বাইরের একজনকে দলের মাথায় বসিয়ে দেওয়া সত্বেও বিজেপি চুপ। সমাজবাদী পার্টির বক্তব্য, আসলে বিজেপির চাপের মুখেই বিএসপি নেত্রী ভাইপোকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
আকাশ বিএসপির ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর ছিলেন। সেই সঙ্গে মায়াবতী ঘোষণা করেছিলেন আকাশই দলে তাঁর উত্তরাধিকারী। আগের তিনি ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বছর আঠাশের আকাশ দিল্লিতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব সেরে লন্ডন থেকে এমবিএ করে ২০১৭-তে দেশে ফেরেন। ধীরে ধীরে দলের কাজে যুক্ত হন। গত বছর মায়াবতী তাঁকে জাতীয় সমন্বয়ক ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে ভাইপোই দলে তাঁর উত্তরাধিকারী বলে জানিয়ে দেন। এবার ভোটের স্বভাবতই মায়াবতীর পর আকাশের নামই দলের স্টার ক্যাম্পেনার হিসাবে দু-নম্বরে ছিল। যদিও অসুস্থতার কারণে মায়াবতী প্রচার করেননি। হেলিকপ্টারে রাজ্য চষে বেড়াচ্ছিলেন আকাশ।
ভোটের প্রচার তুঙ্গে উঠলে আচমকা ভাইপোকে পদ থেকে সরিয়ে দেন বিএসপি সুপ্রিমো। এক্স হ্যান্ডেলে মায়াবতী জানান, আকাশের অভিজ্ঞতা কম। তাঁর পক্ষে জাতীয় সমন্বয়কের পদ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই আপাতত তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হল।
মায়াবতী আকাশের অনভিজ্ঞতার কথা বললেও বিএসপি সূত্র এবং রাজনৈতিক মহলের খবর ছিল ভিন্ন। একাধিক সূত্র থেকে জানা গিয়েছিল, আকাশের তীব্র বিজেপি বিরোধিতায় রাশ টানতেই ওই সিদ্ধান্ত নেন দলিত নেত্রী। এখানেই পিসি-ভাইপো রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় সমস্যা হচ্ছিল।
মায়াবতীর কৌশল ছিল ভোটে কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি প্রয়োগ করা। ওই দুই দল এবার জোট করে। শেষ পর্যন্ত সেই জোট বাজিমাত করেছে উত্তর প্রদেশে।
প্রচারে আকাশ, বিরোধী শিবিরের তিন নেতা রাহুল, প্রিয়ঙ্কা, অখিলেশ যাদবদের আক্রমণ না করে নরেন্দ্র মোদী ও যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে ভাষণে ঝড় তুলেছিলেন। বিজেপিতে চলে যাওয়া দলিত ভোট ফেরাতে এই কৌশল নেন ভাইপো। তাতে বাদ সাধেন পিসি।
রাজনৈতিক মহলের খবর, মায়াবতী ভোটের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বিজেপি বিরোধিতায় লাগাম টানেন ইডি-সিবিআইয়ের কারণে। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগে মামলা আছে। কিন্তু ইডি-সিবিআইয়ের থাবা বাঁচিয়ে চলেছেন বিএসপি সুপ্রিমো। ২০১৭-তে যোগী আদিত্যনাথ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়ানো বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি।
সেই সিদ্ধান্তের ফল যে দলের জন্য ভাল হয়নি ২০২২-র পর ২৪-এর লোকসভা ভোটের ফলেই তা স্পষ্ট। ২০২২-র বিধানসভা ভোটে বিধায়ক সংখ্যা ১৭ থেকে কমে এক হয়ে যায় তিনবারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর দলের। ভোট কমে হয় ছয় শতাংশ।
বস্তুত, দু-বছর আগের ওই বিপর্যয়ের পরই ভাইপো আকাশকে দলের নেতৃত্ব নিয়ে আসার আভাস দেন মায়াবতী। ভোট বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ভাইপোকে পাঠান পিসি। পরের বছর আকাশকে দলের দু-নম্বর ঘোষণা করেন।
রাজনৈতিক মহলের খবর, পিসি-ভাইপোর বিরোধের সূত্রপাত হতে দেরি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালের ডিগ্রিধারী মায়াবতী প্রায় চার দশক রাজনীতির প্রথমসারিতে থাকলেও ভাষণে অপটূ। দলের সভা, নির্বাচনী প্রচারেও তিনি লিখিত ভাষণ পাঠ করেন। সেখানে আকাশ হিন্দি, কখনও তাতে ইংরিজি জুড়ে ঝরঝরে ভাষায় ভাষণ দেন। তাই শুধু নয়, ভাষণে তিনি যথেষ্ট আক্রমণাত্মক। সেই আক্রমণ বেশিরভাগটাই বিজেপির বিরুদ্ধে হওয়ায় পিসির সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না আকাশের।
কিন্তু লোকসভা ভোটে ভরাডুবির পর বদলাতে বাধ্য হলেন তিনি। আসলে বিজেপিতে চলে যাওয়া বিএসপির দলিত ভোট এবার কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির ঝুলিতে গিয়েছে। বিএসপির ভাঁড়ার কার্যত শূন্য। এই পরিস্থিতিতে দলকে আন্দোলনমুখি করে তুলতে ভাইপোর উপরই ফের আস্থা রাখলেন দলিত নেত্রী।