মাওবাদী দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বড় ভাঙন। আত্মসমর্পণ নাকি সশস্ত্র লড়াই—এই বিতর্কে দুই শীর্ষ নেতা সোনু ও দেবুজির মধ্যে মতবিরোধ, দলে অস্থিরতা।

মাওবাদে বিভাজন!
শেষ আপডেট: 26 September 2025 15:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এদেশের মাওবাদী দলের অন্দরে বড় ধরনের এক দ্বন্দ্বের খবর সামনে এসেছে। তেলঙ্গানার গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা যাচ্ছে, দলটির দুই শীর্ষ নেতা, মল্লোজুলা ভেনুগোপাল রাও ওরফে সোনু এবং থিপ্পিরি তিরুপতি ওরফে দেবুজি— পৃথক অবস্থান নিয়েছেন। একজন মনে করছেন, সময় এসেছে অস্ত্র নামিয়ে মূল স্রোতে ফিরে যাওয়ার, অন্যজন আবার সশস্ত্র সংগ্রাম আরও জোরদার করার পক্ষ নিয়েছেন।
সর্বভারতীয় সংবাদ সংস্থা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও দাবি করেছে, বর্তমানে দলের আদর্শগত প্রধান সোনু। তিনি আত্মসমর্পণের পক্ষে। অপরদিকে দেবুজি, যিনি আগে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের প্রধান ছিলেন এবং এখন সাধারণ সম্পাদক, তিনি সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা জানিয়েছে, এই বিভাজনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় একাধিক চিঠিতে।
১৫ আগস্ট লেখা এবং ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সোনুর চিঠিতে জানানো হয়, মাওবাদীরা অস্থায়ীভাবে অস্ত্র নামাতে এবং কেন্দ্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তিনি উল্লেখ করেন, নিহত প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক বাসবরাজুও একই মতের ছিলেন। চিঠিতে লেখা হয়, “বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় পরিস্থিতি, এবং প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের বারবার অনুরোধের প্রেক্ষিতে আমরা মূলস্রোতে যোগ দিতে প্রস্তুত।”
১৯ সেপ্টেম্বর তেলঙ্গানা রাজ্য কমিটির মুখপাত্র জগনের স্বাক্ষরিত আরেক চিঠিতে সোনুর বক্তব্যকে তার ব্যক্তিগত মত বলা হয়।
এরপর কেন্দ্রীয় কমিটি, পলিটব্যুরো ও দণ্ডকারণ্য বিশেষ আঞ্চলিক কমিটির পক্ষ থেকে চিঠি প্রকাশিত হয়, যেখানে সোনুর অবস্থানকে “বিশ্বাসঘাতকতা” বলা হয়। সেখানে লেখা হয়, “অস্ত্র সমর্পণ আমাদের নীতি নয়। নিপীড়িত জনগণকে প্রতারণা করা আমাদের কাজ নয়।”
একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–কে বলেন, “চিঠিগুলো দলটির ভেতরের দ্বিমুখী লড়াই স্পষ্ট করে। এক অংশ বলছে সময় এসেছে অস্ত্র ফেলার, আর এক অংশ বলছে এখনই লড়াই জোরদার করার।”
কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বশেষ চিঠিতে লেখা হয়, “দেশ-বিদেশের যা সামগ্রিক পরিস্থিতি, তা সশস্ত্র লড়াই ত্যাগের ইঙ্গিত দেয় না, বরং এই লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তাই প্রমাণ করে।” কর্মকর্তাদের মতে, দেবুজির সমর্থনেই এই চিঠি প্রকাশিত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, দেবুজির মাথার দাম এক কোটি টাকা। তিনি তেলঙ্গানার জগতিয়ালের বাসিন্দা। সোনুর মাথার দামও একই অঙ্কে ধরা আছে। তিনিও তেলঙ্গানার পেডাপাল্লির মানুষ।
সূত্র বলছে, এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়—প্রায় এক বছর ধরেই চলছে। সোনুর স্ত্রী তারাক্কা গত বছর মহারাষ্ট্রে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর ভাই কিষেনজির স্ত্রী পি. পদ্মাবতীও এ বছরের সেপ্টেম্বরেই তেলঙ্গানায় আত্মসমর্পণ করেছেন। ২০২৪ সালে দলের পলিটব্যুরো এক নথিতে স্বীকার করেছিল, তাদের সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং পশ্চাদপসরণের সময় এসেছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, “দলের একটি অংশ, যারা আদর্শিক ভিত্তি ধরে রেখেছে— তারা আত্মসমর্পণ ও গণতান্ত্রিক পথে হাঁটার কথা ভাবছে। অন্য অংশ আবার কঠোরভাবে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে। অতীতে বহু সশস্ত্র দল গণতান্ত্রিক পথে এসেছে, যেমন সিপিআই (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)।”
এমন এক সময়ে এই দলীয় বিভাজন দেখা দিয়েছে, যখন নিরাপত্তা বাহিনী মাওবাদীদের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযান চালাচ্ছে। এমনিতেই, যেখানে একসময় কেন্দ্রীয় কমিটিতে ১৯ জন সদস্য ছিলেন, এখন সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে। এই পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা কর্তা মন্তব্য করেন, “সঙ্কট গভীর, আর সেই সঙ্কটে দলের দুই শাখা ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।”