দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯ বছর বয়সি এক তরুণীর ধর্ষণ ও হত্যার তদন্ত চলছিল গুজরাতে। অপরাধীকে চিহ্নিত করার পরেই হাড় হিম হয়ে গেল পুলিশের। কারণ অভিযুক্তের সঙ্গে সংযোগ মিলল এর আগেও ঘটে যাওয়া একের পর এক খুনের! পুলিশ জানিয়েছে, ওই ব্যক্তি একজন সিরিয়াল কিলার (Serial Killer)বলে প্রায় নিশ্চিত তারা। সে পরিকল্পনা করে একই ধরনের খুন করে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে।
শুধু তাই নয়। সম্প্রতি বাংলায় কাটিহার এক্সপ্রেসে এক তবলাবাদকের খুনের ঘটনাতেও যোগ মিলেছে তার! গত সপ্তাহে সকাল সওয়া ৭টা নাগাদ, যখন ডাউন কাটিহার এক্সপ্রেস হাওড়া স্টেশনে ঢোকে তখন ওই ট্রেনের ঠিক পেছনের কামরায় প্রতিবন্ধীদের জন্য যে সংরক্ষিত কোচ থাকে, সেই কোচের বাঙ্ক থেকে চাদর চাপা দেওয়া অবস্থায় দেহ উদ্ধার হয়। শরীরে ধারালো অস্ত্রের কোপ ছিল এবং রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। ট্রেনে তল্লাশি চালানোর সময় দেহটি নজরে আসে আরপিএফ কর্মীদের।
পরে জানা যায় মৃত ওই ব্যক্তির নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পেশায় তবলাবাদক ওই ব্যক্তি বালির নিশ্চিন্দা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। প্রায়ই তিনি কাটিহার জেতেন তবলা শেখানোর জন্য। ১৮ নভেম্বর প্রথম তিনি কাটিহার যান এবং ২০ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ কাটিহার থেকে ট্রেন ধরেন। ২১ তারিখ তাঁর বাড়ি ফিরে আসার কথা। কিন্তু বাড়ি ফিরছেন না দেখে পরিবারের তরফ থেকে একাধিক জায়গায় খোঁজ নেওয়া হয়। শেষে হাওড়া জিআরপি-তে এসে জানতে পারেন তাদের পরিবারের লোক খুন হয়েছেন।
ঘটনার পরই পরিবারের তরফে পুলিশে অভিযোগ জানানো হয়। পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির গোয়েন্দারাও তদন্ত শুরু করেন। তবলা বাদকের সঙ্গে থাকা ফোন, টাকা ও নথি খোয়া গেছে বলে পরিবারের তরফ থেকে জানানো হয়। অবশেষে তবলাবাদকের মোবাইল ফোনের সূত্রেই খোঁজ মিলল অভিযুক্তের। পুলিশ জানায়, ধৃতের নাম রাহুল ওরফে ভোলু। গুজরাত থেকে ট্রানজিট রিমান্ডে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
জানা গেছে, হরিয়ানার রোহতকের বাসিন্দা রাহুল করমবীর জাঠকে গুজরাতের ভালসাদের বাপি রেলওয়ে স্টেশন থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের বিশাল বড় এক বাহিনীর চেষ্টায়, প্রায় ২ হাজার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করে এই গ্রেফতারি সম্ভব হয়েছে। সে আগে জোধপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি ছিল। তার বিরুদ্ধে ১৩টি এফআইআর রয়েছে।
পুলিশ সূত্রের খবর, সম্প্রতি ১৯ বছরের মেয়েটির খুনের তদন্ত করতে গিয়ে, আগের কয়েকটি ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার মিল পাওয়া যায়। সব সূত্র মিলিয়ে, অভিযান চালিয়ে, শেষমেশ অভিযুক্ত ধরা পড়লে, সিরিয়াল কিলার হিসেবে তাকে চিহ্নিত করে পুলিশ।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, একের পর এক মহিলাকে ফাঁদে ফেলে, ধর্ষণের পর হত্যা করত সে এবং দেহ পুড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ মুছে ফেলত। তদন্তে উঠে এসেছে, এই অপরাধী নিজের অপরাধের ধরন ও কৌশল নিয়ে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ছিল। ঠিক পর্দায় দেখা বিভিন্ন মিস্ট্রি সিরিজের কায়দাতেই চলত অপারেশন।
গত এক মাসে দেশের নানা প্রান্তে অন্তত পাঁচটি এমন ধর্ষণ-খুন ঘটিয়েছে রাহুল। মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা, কর্নাটকের পাশাপাশি বাদ নেই বাংলাও। বাংলায় এক তরুণীকে খুন-ধর্ষণ করেই সেক্ষান্ত হয়নি, তার পরে মেরেছে এক ব্যক্তিকেও। কাটিহার এক্সপ্রেসে সেই তবলাবাদকের খুনের তদন্তে রাজ্য পুলিশ আগেই চিহ্নিত করেছিল এই রাহুলকে। এবার তার সঙ্গে যোগ মিলল সিরিয়াল কিলিংয়ের!
ট্রেনের কামরায় একলা মহিলাদের টার্গেট করত সে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী কামরায় একলা মেয়ে যাতায়াত করলে, তাকেই 'শিকার' করত রাহুল। ট্রেনেই ধর্ষণ করে মেরে ফেলত মহিলাকে। তার পরে লোপাট করত প্রমাণ।
রাহলের করা অপরাধগুলি একের পর এক পুলিশের খাতায় জমতে থাকলেও, তাকে চিহ্নিত করা কঠিন ছিল। তার মূল কারণ, রাহুল কখনওই কোনও নির্দিষ্ট জায়গায় থাকত না অপরাধের পরে। সে ক্রমাগত ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়াত। প্ল্যাটফর্মে রাত কাটাত, ট্রেনের কামরায় দিন কাটাত। ফলে প্রমাণ মেলার পরেও তার টিকি ছুঁতে পারছি না পুলিশ।
জানা গেছে, অভিযুক্ত ক্লাস ফাইভের পরে আর পড়াশোনা করেনি। একটি মদের কারখানায় চাকরি করত সে। গুজরাতে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পরে সেই চাকরি চলে যায়। এরপরেই সে একের পর এক মহিলাকে ধর্ষণ করে, খুন করতে শুরু করে। নির্দিষ্ট একটি পদ্ধতিতে শিকারকে ধর্ষণ ও হত্যা করাই ছিল তার ধারাবাহিক পরিকল্পনা। অভিযুক্তকে জেরা করে অতীতের আরও অপরাধের তথ্য প্রকাশ করার চেষ্টা চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনা সমাজে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। মহিলাদের নিরাপত্তার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে প্রশাসনকে। পুলিশ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে প্রযুক্তি-সহায়ক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।