
ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 3 April 2025 11:10
বঙ্গোপসাগর-ভিত্তিক বোঝাপড়ার মঞ্চ বিমস্টেকের সম্মেলনে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার সকালে ব্যাঙ্কক রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। ঢাকা থেকে ব্যাঙ্ককের বিমানে উঠেছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসও (Muhammad Yunus)। বৃহস্পতি ও শুক্রবার এই সম্মেলন চলবে।
ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির এই মঞ্চের বাকি সদস্য দেশগুলি হল এবারের সম্মেলনের আয়োজক তাইল্যান্ড, মায়ানমার এবং নেপাল, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কা। ব্যাঙ্ককের সম্মেলন থেকে বিমস্টেকের সভাপতিত্বের ভার বাংলাদেশের হাতে অর্পণ করা হবে। সেদিক থেকে বিমস্টেকের ব্যাঙ্কক সম্মেলন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস ও তাঁর দেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আলোচনা আন্দোলিত হচ্ছে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মহম্মদ ইউনুসের বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে। বাংলাদেশ সরকার খুব করে চাইছে ব্যাঙ্ককের সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতা একান্তে বৈঠক করুন। বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অফিস বুধবার জোরের সঙ্গে দাবি করেছে, ৪ এপ্রিল অর্থাৎ শুক্রবার এই বৈঠক হচ্ছে। বাংলাদেশের একাধিক প্রথমসারির মিডিয়াও তাদের সুত্র উল্লেখ করে জানিয়েছে, বৈঠকটি অবশেষে হচ্ছে। ভারতের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া গিয়েছে।
যদিও বৃহস্পতিবার সকালে নয়াদিল্লি প্রধানমন্ত্রী ব্যাঙ্কক রওনা হওয়া পর্যন্ত ইউনুসের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে মুখে খোলেনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সরকারিভাবে ঘোষিত সফরসুচিতেও বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের উল্লেখ নেই। এই বৈঠক চেয়ে বাংলাদেশ সরকার বারে বারে অনুরোধ করেছে। বৈঠকের আর্জি জানিয়ে তারা নয়াদিল্লিকে চিঠিও লিখেছে।
ইউনুস কেন মোদীর সঙ্গে বৈঠকে বসতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন? তার অনেকগুলি কারণ আছে। অন্যতম হল, ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে ফিরে আসার পর থেকেই মোদীর সঙ্গে সখ্য তৈরি করতে ইউনুস মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কারণ, মার্কিন প্রশাসন ইতিমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে, ট্রাম্প তাঁর আগের জমানার মতো এবারও বাংলাদেশকে অনেকটাই ভারতের চোখ দিয়ে দেখবেন। তাই নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ স্থাপন করতে চাইছেন।
ইউনুসের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল কূটনৈতিক মহল এবং নিজের দেশবাসীকে দেখানো যে চিনের প্রেসিডেন্টের পর তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী অর্থাৎ এশিয়ার দুই শক্তিধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে কয়েকদিনের ব্যবধানে বৈঠক করেছেন। তৃতীয় উদ্দেশ্যটি হল, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতনের ঘটনাগুলি নিয়ে ভারতের সঙ্গে মিটমাট করে নেওয়া। আমেরিকা, ইউরোপের বহু দেশ ও সংগঠন সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। মোদীর সঙ্গে বৈঠকের ছবি দেখিয়ে ইউনুস দাবি করতে পারবেন এই ইস্যুর নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে।
অন্যদিকে, ইউনুসের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের প্রস্তাবে ভারত সাড়া না দেওয়ার অন্যতম কারণ ইউনুসের সময়ে বাংলাদেশে উগ্র ইসলামিক শক্তির উত্থান এবং সে দেশের সরকারের তরফে তা দমনের পরিবর্তে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ। এছাড়া সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতনের ঘটনাগুলিকে রাজনৈতিক বলে লঘু করে দেখানো। এর বাইরে আছে চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ইউনুসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে দৃশ্যমান বন্ধুত্ব এবং সে দেশের মাটিতে ভারত বিরোধী কার্যকলাপ। একদিকে, ইউনুস ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সখ্য গড়তে চাইছেন, অন্যদিকে, তিনি চিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ‘ল্যান্ড লকড’ বা অবরুদ্ধ ভূখণ্ড বলে অভিহিত করে খোঁচা দিচ্ছেন।
কিন্তু এত কিছুর পরও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউনুসের বৈঠকটি হওয়া দরকার। চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার বর্তমান নেতৃত্ব যখন ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে, তখন ভারতের হাত গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। আটমাস আগেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। বাংলাদেশে সেই সম্পর্ক এখন অস্বীকার করলেও ভারতের উচিত হবে না তা একবাক্যে মেনে নেওয়া। বরং ভারসাম্যের কূটনীতির অঙ্কে চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা আটকাতে হলে নয়াদিল্লি-ঢাকা সুসম্পর্ক জরুরি। বাংলাদেশ পুরোপুরি পাকিস্তান ও চিনের খপ্পরে পড়ার আগে ভারতে দান ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, চিন ও পাকিস্তানের বাংলাদেশ প্রীতি দিনের শেষে ভারতের জন্যই বিপদের কারণ হতে পারে। হিন্দুস্থানের ক্ষতি করার আরও একটা সুযোগ খুঁজতে পারে পাকিস্তান। যে ভূখণ্ড ৫৫ বছর আগে তাদের হাতছাড়া হওয়ার পিছনে ভারতের হাত ছিল সেখান থেকে হিন্দুস্থান বিরোধী কার্যকলাপ চালানোর চেষ্টা ইসলামাবাদের শাসকেরা করবেন, এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে!
তাছাড়া, ব্যাঙ্ককের পার্শ্ববৈঠকের ব্যাপারে যেহেতু বাংলাদেশের তরফে বারে বারে উৎসাহ দেখানো হয়েছে, অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয় তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সামনে এই অবকাশে সুযোগ রয়েছে মহম্মদ ইউনুসকে মুখের উপর জবাব দেওয়ার। একমাত্র কূটনীতিতেই হাসিমুখে, গোলাপ বিনিময় করে কড়া কথা শোনানো যায়। গত বছর ইউনুস দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই মোদী তাঁকে ফোনে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনাগুলি নিয়ে উদ্বেগ, অসন্তোষের কথা বলেছিলেন। এবার মুখোমুখি বৈঠকে জবাব দেওয়া দরকার।