
ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 19 September 2024 16:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'ভোলার নয়!' আর সে কারণেই কান্দাহার বিমান ছিনতাইয়ের একটি বুলেট তাঁর দফতরে 'অবিস্মরণীয় স্মৃতি' হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিং। IC814 ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের এই বিমান ছিনতাই নড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশের মানুষ, রাজনীতি এমনকী আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বিশ্ব পরিমণ্ডলকে। সম্প্রতি এই সত্য ঘটনা অবলম্বনে ওয়েব সিরিজটি ইতিমধ্যেই জনপ্রিয় হয়েছে। যেখানে পঙ্কজ কাপুর বিদেশমন্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। যদিও সত্য ও পর্দার গল্প সবসময় এক হয় না। কিন্তু, সেই সময় প্রাক্তন সেনাকর্মী যশবন্ত সিংয়ের কূটনৈতিক ভূমিকা অনেকেই জানেন।
সেদিনটা ছিল ১৯৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর। সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা। দুবাইয়ের ভারতীয় কনসাল জেনারেল অশোক মুখোপাধ্যায়ের টেবিলের ফোন বেজে উঠল। ওপার থেকে মেঘের ডাকের মতো গলায় একজন জিজ্ঞাসা করলেন, মাই ডিয়ার বয়, তোমার কী মনে হয়, এই বিমানটি কোথায় যাবে? অশোকবাবুও সেকেন্ডের মধ্যে সেই গলা চিনতে পারলেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন। সেই কণ্ঠটি ছিল, তখনকার বিদেশমন্ত্রী যশবন্তেরই।
ছিনতাই হওয়া IC814-কে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি দুবাইতে নামতে বাধা দিলে সেখানকার ভারতীয় রাষ্ট্রদূত কেসি সিং তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় কাজে লাগিয়ে সেদেশের বিমানবাহিনীর কমান্ডারের মন গলাতে সক্ষম হন। তিনি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ওই বিমানকে আল মিনহাদ এয়ারবেসে নামার অনুমতি দিলেও দুই ভারতীয় কূটনীতিককে সেখানে যেতে মানা করেন। যদিও অন্য গাড়ি ঢোকায় কোনও নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে সকাল প্রায় ৪টে নাগাদ এসইউভিতে চড়ে একদল লোক এয়ারবেসে ঢুকে পড়ে। সকাল সওয়া ৫টা নাগাদ ভারতীয় গাড়ি এয়ারবেসে ঢুকলেও তার কিছুক্ষণ পরেই বিমানটি ফের অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে রওনা দেয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ IC814-র পরবর্তী গন্তব্যের কথা জানতে পারে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্যভাবে এক ব্যক্তির কাছ থেকে।
তিনি হলেন আরিয়ানা আফগান এয়ারলাইন্সের দুবাইয়ের স্টেশন ম্যানেজার। যিনি ১৯৯৬ সালে তালিবানের আফগানিস্তানের পর থেকে একটি ভারতীয় ভিসা জোগাড়ের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন। সেই স্টেশন ম্যানেজারই অশোক মুখোপাধ্যায়কে ফোনে বলেন, আপনি কি জানেন ওরা কোথায় যাচ্ছে? অসহায় অশোকবাবু না বলায় উনি নিজেই জানান, ওরা বিমান নিয়ে কান্দাহার রওনা দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে গোটা ভারতে দুঃস্বপ্নের মতো বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী তখন ছিলেন একজন যুগ্মসচিব পর্যায়ের অফিসার। তাঁকে একবার সাবেক বাজপেয়ি সরকারের বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিংয়ের পুত্র মানবেন্দ্র সিং বলেছিলেন, ছিনতাইয়ের পর কতজন বিদেশমন্ত্রী আমার বাবার শোওয়ার ঘরে গভীর রাতেও ফোন করেছিলেন তা প্রকাশ্যে আনুন। তা শুনে তিনি লাফিয়ে উঠেছিলেন।
ইংরেজি সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টে যশবন্ত-পুত্র মানবেন্দ্র এক নিবন্ধে লিখেছেন, ছিনতাইয়ের পর থেকে আমার বাবা প্রতিদিন মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে ফোন ধরতেন। ওই বিমানের এক কর্মীর স্ত্রী তাঁকে ফোন করতেন। প্রতিরাতে বিছানায় বসে তিনি ওই মহিলার কান্না শুনতেন। এটা একটা রুটিনে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, আমার বাবা যেন রাতে ওই ফোনটির জন্য অপেক্ষা করতেন। ফোন আসার পর তিনি শুতে যেতেন।
মানবেন্দ্র আরও লিখেছেন, যখন ছিনতাইয়ের ঘটনা হাতের বেরিয়ে যাচ্ছে তখন আমার বাবা বলেছিলেন, শতাধিক মানুষের জীবন মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া যায় না। দেশের নৈতিক দায়িত্ব হল নির্দোষ নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। বেশ কয়েক মাস পর সাউথ ব্লকে তাঁর অফিসে আমি গিয়েছিলাম। মানবেন্দ্র লিখেছেন, আমি দেখলাম একটা অদ্ভুত জিনিস সাজানো রয়েছে। একজন বিদেশমন্ত্রীর পক্ষে যা সম্পূর্ণ অকূটনৈতিক বিষয়। কারণ ওই দফতরে বহু কূটনীতিক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন।
মানবেন্দ্র লিখেছেন, দেখলাম ৯ মিমি অটোমেটিক পিস্তলের কয়েকটি বুলেট সাজিয়ে রাখা আছে। পাঁচ থেকে ছটি বুলেট রাখা ছিল সেখানে। যেগুলি ছিনতাইকারীরা বিমানে ফেলে গিয়েছিল। সাজানো বুলেটগুলির বাক্সের গায়ে লেখা ছিল, ভোলার নয়। সত্যি কান্দাহার বিমান ছিনতাইয়ের কথা আমার বাবা কোনওদিন ভুলতে পারেননি।