
শিল্পীর চোখে জালিওয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড - দ্য ওয়াল ফাইল ।
শেষ আপডেট: 13 April 2024 15:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯ সাল। সেটাও ছিল পাঞ্জাবি তথা শিখ সম্প্রদায়ের বৈশাখীর মতো একটি অতি পবিত্র দিন। সেই দিনটাই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসের একটি কলঙ্কময় অধ্যায় হয়ে রয়ে গিয়েছে। পাঞ্জাবের অমৃতসরের বিক্ষোভরত নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল সেদিন ব্রিটিশ রাজশক্তি। পরিণতিতে শত শত লোকের মৃত্যু হয়। রাওলাট আইনের প্রতিবাদে জালিয়ানওয়ালাবাগে জনসমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সমাবেশ চলাকালীন চারদিক ঘিরে ব্রিটিশ পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে প্রাণ হারিয়েছিলেন হাজারের বেশি মানুষ। জখম হন ১ হাজার ২০০ জন। ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয় সারা দেশ। নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক রাওলাট আইন পাশ করা হয়েছিল। আইনে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বিনা বিচারে যে কাউকে কারারুদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। আইনটি পাশ হতেই, ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন দেশের হাজার হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামী। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড বলে পরিচিত ওই ঘটনার সূচনা অমৃতসরের একটি সমাবেশ থেকে।
অমৃতসর শিখ সম্প্রদায়ের একটি পবিত্র শহর। এই শহরেই শিখদের পবিত্র স্বর্ণমন্দির। সে বছর এই শহরে স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছিল। এপ্রিলের ১৩ তারিখ শহরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার খবর পেলেন জালিয়ানওয়ালাবাগে বিক্ষোভের জন্য মানুষজন জড়ো হচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি একদল সৈন্য নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে গেলেন।
ওই ঘটনা সম্পর্কে যে রিপোর্ট তিনি ব্রিটিশ সরকারকে দিয়েছিলেন তার বর্ণনা ছিল এরকম। সরু একটি গলির ভিতর দিয়ে আমি উদ্যানে ঢুকলাম। রাস্তা সরু হওয়ায় আমাকে আমার সাঁজোয়া গাড়ি রেখে আসতে হয়েছিল। পার্কে ঢুকে দেখলাম হাজার পাঁচেক মানুষ। একজন মানুষ একটি উঁচু বেদিতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে ভাষণ দিচ্ছে। আমি বুঝলাম মানুষের তুলনায় আমার সৈন্য সংখ্যা অনেক কম। আমি গুলির নির্দেশ দিলাম। দু’শ থেকে তিনশ লোক মারা যায়। ১৬৫০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে আমি সেনা সদর দফতরে ফিরে যাই।
অমৃতসরের পরিস্থিতি সামাল দিতেই ব্রিগেডিয়ার ডায়ারকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি এসেই শহরে যে কোন ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেন। কিন্তু অনেক মানুষ এই সিদ্ধান্তের কথা জানতেন না। জালিয়ানওয়ালাবাগে সেদিন সকলে এসেছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী সভায় যোগ দিতে।
সার্জেন্ট উইলিয়াম অ্যান্ডারসন ব্রিগেডিয়ার ডায়ারের অধীনে কাজ করতেন। ঘটনা সম্পর্কে পরে তিনি লিখেছিলেন, যখন গুলি শুরু হল, মানুষ মাটিতে শুয়ে পড়তে লাগল। কেউ কেউ উঁচু দেোয়াল বেয়ে উঠে পালানোর চেষ্টা করছিল। তারা যে আমাদের দিকে তেড়ে আসবে, সেই ভয় তখন আমার হয়নি।
পাপা সিং তখন চার বছরের বাচ্চা। ২০০৯ সালে বিবিসির একটি প্রামাণ্যচিত্রে তিনি বলেছিলেন, মানুষ দিগ্বিদিকে ছোটাছুটি করছিল। চারদিকে চিৎকার এবং কান্নার শব্দ। আমার দাদু আমাকে নিয়ে ছুটছিলেন। আমরা পার্কের দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে পালাচ্ছিলাম। আমার এক কাকা পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলেছিল। আমরা পরে নিজেদের অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করেছিলাম, কারণ আমরা সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম।
কত লোক সেদিন জালিয়ানওয়ালাবাগে ছিলেন, তা নিয়ে নানা বক্তব্য রয়েছে। বিশ হাজার লোকও হতে পারে, যাদের মধ্যে অনেকেই শিশু ও মহিলা। হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরে ব্রিটিশ সরকার একটি তদন্ত করে। রিপোর্টে নিহতের সংখ্যা বলা হয় ৩৭৯। কিন্তু, এই সংখ্যা প্রায় এক হাজার।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ দেশের বহু নেতানেত্রী আজ, শনিবার দিনটিকে স্মরণ করেছেন। এক্সবার্তায় তিনি লিখেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হওয়া কয়েকশো প্রতিবাদীকে বেপরোয়া গুলি চালিয়ে এদিন হত্যা করেছিল ব্রিটিশ বাহিনী। আমার দেশের পরিবারের পক্ষ থেকে আমি সেই দিনটিকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। সেদিন শহিদ হওয়া প্রতিটি দেশপ্রেমীকে প্রণাম করি।