
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড।
শেষ আপডেট: 13 April 2025 15:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের ইতিহাসের পাতায় এক রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল। জালিয়ানওয়ালাবাগের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের এই দিনে আজও শোকের ছায়া নেমে আসে পাঞ্জাবে। তবে সেই ছায়ায় মিশে থাকে দাঁতে দাঁত চাপা রাগও। এই দিনেই ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড মাইকেল ডায়ার এবং এক ভারতীয় বিশ্বাসঘাতক হংস রাজ মিলে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করেন।
সেই কুখ্যাত ডায়ার, যিনি ইতিহাসে ‘অমৃতসরের কসাই’ নামে পরিচিত। আর হংস রাজ নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন কয়েক হাজার প্রাণ। এই দুই চরিত্রের রক্তমাখা কাহিনি আজও কাঁপিয়ে দেয় দেশবাসীকে।
১৯১৯ সালের পাঞ্জাব তখন রাউলাট আইন ও ব্রিটিশ ভয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট। বলশেভিক প্রভাবের আতঙ্কে ব্রিটিশরা ভারতজুড়ে কঠোর দমননীতিতে মেতে ওঠে। রাউলাট আইন ছিল এক নিষ্ঠুর আইন—বিচারহীন গ্রেফতার, আপিলের অধিকার না থাকা, এমনকি কোনও সওয়াল-জবাব ছাড়াই শাস্তি।
ওই বছরেই ৯ এপ্রিল, রামনবমীর দিনে পাঞ্জাবে হিন্দু ও মুসলমানেরা একত্রিত হয়ে রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ লাহোরের এক মসজিদ থেকে ভাষণ দেন, স্লোগান ওঠে 'হিন্দু-মুসলিমকি জয়'। আসলে এই ঐক্যের ভয়ে ব্রিটিশরা অস্থির হয়ে ওঠে।
১০ এপ্রিল, ডঃ সত্যপাল ও ব্যারিস্টার সাইফুদ্দিন কিচলু, দুই কংগ্রেস নেতাকে ডেপুটি কমিশনার মাইলস আয়ারভিং-এর অফিসে ডেকে গ্রেফতার করা হয় এবং পাঠিয়ে দেওয়া হয় ধর্মশালায়। তাঁদের বন্ধুই ছিল হংস রাজ, যিনি পরিবারের কাছে তাঁদের চিঠি পৌঁছে দেওয়ার নাম করে বেরিয়ে যান।
শহরে এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। পুলিশ গুলি চালায়, ১০ জন মারা যায়। উত্তেজিত জনতা মিশনারি স্কুলের ম্যানেজার মিস শেরউডকে মারধর করে, নগ্ন করে রাস্তায় ফেলে দেয়। পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে।
১৩ এপ্রিল, ১৬৯৯ সালের এই দিনে গুরু গোবিন্দ সিং আনান্দপুর সাহিবে ‘খালসা’র ঘোষণা করেন। এই দিনটি পাঞ্জাবে বৈশাখী উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। অথচ ১৯১৯ সালের এই বৈশাখী উৎসব ছিল অন্ধকার ও আতঙ্কে ঢাকা।
ব্রিটিশরা নিষেধাজ্ঞা জারি করে জমায়েতের ওপর। তবু হংস রাজ জালিয়ানওয়ালাবাগে সভার ডাক দেন। পরিকল্পনা করেই। দুপুর ২টো নাগাদ সেখানে জড়ো হন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। নারী, পুরুষ, শিশু, কৃষক, প্রতিবাদী, তীর্থযাত্রী-- কে না ছিল সেই ভিড়ে!
এমনই সময়ে ডায়ার প্রায় ১০০ সৈন্য নিয়ে হাজির হন সেখানে। গোর্খা ও শিখ রেজিমেন্টের সৈন্যরা .৩০৩ রাইফেল নিয়ে পার্কের প্রবেশপথ দখল করে নেয়। কোনও রকম পূর্বঘোষণা ছাড়াই গুলি চালানো শুরু হয়।
এমন সময়ে হংস রাজ মঞ্চে উঠে সাদা পতাকা ওড়ান এবং বলেন, 'ভয় পেও না, সেনারা কিছু করবে না।' অনেকে মনে করেন, এই সাদা পতাকাই ছিল গোপন সংকেত।
প্রায় ১০ মিনিটে ১৬০০ রাউন্ড গুলি চলে। সরকারিভাবে নিহতের সংখ্যা বলা হয় ৩৭৯, কিন্তু পরে জানা যায়, মৃতের সংখ্যা পেরিয়েছিল হাজার। শুধু গুলিতে মৃত্যু নয়, প্রাণের ভয়ে অনেকেই জালিয়ানওয়ালাবাগের গভীর কুয়োয় ঝাঁপ দেন, অনেকে পদপিষ্ট হয়ে মারা যান। পার্কে ঢোকার ও বেরোনোর পথ ছিল সংকীর্ণ, ফলে পালানোর উপায়ও ছিল না।
হংস রাজের ভূমিকা নিয়ে রহস্য আজও কাটেনি। পরে তিনি সরকার পক্ষের সাক্ষী হয়ে নিজের সঙ্গীদের বিরুদ্ধেই কথা বলেন। ব্রিটিশরা তাকে ইরাকে পাঠিয়ে দেয় দেশের মানুষের রোষ থেকে বাঁচাতে।
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, হংস রাজ ছিলেন ব্রিটিশদের গুপ্তচর। মঞ্চ তৈরি, সভা ডাকা, সাদা পতাকা ওড়ানো—এ সবই ছিল তাঁর পূর্বপরিকল্পনা। ইতিহাসবিদ ভিএন দত্ত তার বইতে বলেন, 'ঘটনার আগে তাঁর আচরণ এবং পুলিশের ভূমিকা ইঙ্গিত দেয় এটি পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদ ছিল।'
অন্যদিকে ইতিহাসবিদ কিম ওয়াগনার মনে করেন, হংস রাজ শুধুই একজন সুবিধাবাদী ছিলেন।
আটের দশকের সিমলায়, শীতকালের বরফে ঢাকা পাহাড়ে, এয়ারগান হাতে শিকার করে বেড়ত এক কিশোর। একদিন তার গুলিতে আহত হয় এক বাঁদর। সেই অবোলা প্রাণীর আর্তনাদ ও বুকফাটা কান্নায় খুবই কষ্ট পেয়েছিল সে কিশোরমন। এমনকি শিকার করাই ছেড়ে দিয়েছিল সে।
সেদিনের সেই কোমল হৃদয়ের ছেলেটিই যে ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে ইতিহাসের কুখ্যাত কসাই, ডায়ার, তা বোধহয় স্বয়ং বিধাতাও ভাবেননি। ভাবেননি, শিকার না করার প্রতিজ্ঞা করা ছেলেটিই হয়ে উঠবেন গণহত্যার রূপকার।

বড় হওয়ার পরেও আড়াসে থাকতেই পছন্দ করতেন অন্তর্মুখী স্বভাবের শান্তশিষ্ট ডায়ার। ভুগতেন তীব্র হীনম্মন্যতাতেও। অথচ সেই তিনিই ব্রিটিশরাজ বাঁচাতে সেদিন নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়েও ডায়ার কখনও স্বীকার করেননি, তিনি ভুল করেছিলেন। তিনি উল্টে বলেন, 'আমি যা করেছিলাম, তাতে আর এক ১৮৫৭-এর বিদ্রোহ থামানো গেছে।' তবে তিনি নিজের বিচারের ভার ছেড়ে দেন 'ঈশ্বরের ওপর।'
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড শুধুই এক নারকীয় ঘটনা নয়, এটি এক নিষ্ঠুর পরিকল্পনা ও বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত রূপ। একজন কসাই, আর একজন বিশ্বাসঘাতক মিলে ইতিহাসে রক্তের রেখায় লিখে রেখে গেছেন হাজারো শহিদের আর্তনাদ।