ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে আসন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) অংশ হিসেবে ভারতে আমদানি করা ইউরোপীয় গাড়ির উপর শুল্ক ১১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশে নামাতে সম্মত হয়েছে মোদী সরকার।

এর ফলে Volkswagen, Mercedes-Benz, BMW–র মতো ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা ভারতীয় বাজারে আরও সহজে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।
শেষ আপডেট: 26 January 2026 10:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে আসন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) অংশ হিসেবে ভারতে আমদানি করা ইউরোপীয় গাড়ির উপর শুল্ক ১১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশে নামাতে সম্মত হয়েছে মোদী সরকার। এটি ভারতের বিশাল গাড়ির বাজার খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। সংবাদ সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের তৈরি, ১৫ হাজার ইউরোর বেশি দামের সীমিত সংখ্যক গাড়ির উপর এই শুল্কছাড় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। পরবর্তী ধাপে এই শুল্ক ধীরে ধীরে আরও কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানো হবে। এর ফলে Volkswagen, Mercedes-Benz, BMW–র মতো ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা ভারতীয় বাজারে আরও সহজে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। আলোচনা এখনও গোপনীয় এবং শেষ মুহূর্তে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রক ও ইউরোপীয় কমিশন দু’পক্ষই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে।
ভারত ও ইইউ মঙ্গলবারই দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত ঘোষণা করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। চুক্তিটি ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক মহলে পরিচিতি পেয়েছে— “মাদার অফ অল ডিলস” নামে। এই চুক্তির ফলে দুই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য বহুগুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বস্ত্র ও গয়নার মতো ভারতীয় রপ্তানি পণ্য উপকৃত হবে, যেগুলি গত অগস্ট থেকে আমেরিকার ৫০ শতাংশ শুল্কের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত।
ভারত বর্তমানে বিক্রির নিরিখে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গাড়ির বাজার— আমেরিকা ও চিনের পরেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটি অন্যতম সবচেয়ে সুরক্ষিত বাজার। বিদেশি গাড়ির উপর এখন ভারত ৭০ থেকে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসায়, যা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতাদের ক্ষোভের কারণ। টেসলার সিইও ইলন মাস্ক-সহ বহু শিল্পপতি এই শুল্ককে “অযৌক্তিক” বলে সমালোচনা করেছেন। সূত্রের দাবি, প্রথম ধাপে বছরে প্রায় ২ লক্ষ পেট্রল-ডিজেল গাড়ির উপর শুল্ক কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হবে। এটি ভারতের গাড়ির মুক্ত বাজার খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্ত।
তবে ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) এই শুল্কছাড়ের আওতায় আসবে না প্রথম পাঁচ বছর। কারণ, দেশীয় সংস্থা মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা ও টাটা মোটরস ইতিমধ্যেই এই খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। সরকার চায় না বিদেশি গাড়ির চাপে সেই বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। পাঁচ বছর পরে EV ক্ষেত্রেও একই ধরনের শুল্কছাড় কার্যকর হবে বলে সূত্রের দাবি।
বর্তমানে ভারতের ৪৪ লক্ষ ইউনিটের বার্ষিক গাড়ির বাজারে ইউরোপীয় সংস্থাগুলির অংশীদারি ৪ শতাংশেরও কম। বাজার মূলত নিয়ন্ত্রণ করছে জাপানের সুজুকি, এবং ভারতীয় ব্র্যান্ড টাটা ও মাহিন্দ্রা— এই দুই সংস্থা মিলিয়ে বাজারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ তাদের গচ্ছিত রয়েছে। শুল্ক কমলে ইউরোপীয় সংস্থাগুলি কম দামে গাড়ি বিক্রি করতে পারবে এবং নতুন মডেল এনে বাজার যাচাই করার সুযোগ পাবে। স্থানীয় উৎপাদনে বড় বিনিয়োগের আগে এটি কার্যত এক ধরনের ‘টেস্ট রান’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের গাড়ির বাজার ৬০ লক্ষ ইউনিটে পৌঁছাতে পারে। সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই ইউরোপীয় সংস্থাগুলি নতুন করে ভারতে বিনিয়োগ শুরু করেছে। Renault ইউরোপে চিনা গাড়ির তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ভারতের দিকে নতুন কৌশল নিয়ে ফিরছে। অন্যদিকে Volkswagen Group তাদের Skoda ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ভারতে পরবর্তী দফার বিনিয়োগ চূড়ান্ত করছে। সব মিলিয়ে, এই শুল্কছাড় শুধু বাণিজ্য চুক্তির অংশ নয়— ভারতের অটোমোবাইল শিল্পে এক যুগান্তকারী মোড় বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।