এই চুক্তি কার্যকর হলে শুধু আর্থিক দিক থেকেই নয়, প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে প্রায় ১০০টি রাফাল যুদ্ধবিমান ভারতে উৎপাদনের বন্দোবস্ত থাকছে। তার ফলে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 10 February 2026 11:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের প্রতিরক্ষা (Indian Defence) ক্ষেত্রে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্রচুক্তির পথে বড়সড় অগ্রগতি। ফরাসি সংস্থা দাঁসোর তৈরি ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান (Rafale Airjet) কেনার জন্য প্রায় ৩.২৫ লক্ষ কোটি টাকার চুক্তিতে চলতি সপ্তাহেই ছাড়পত্র দিতে পারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর (Emmanuel Macron) দিল্লি সফরের ঠিক আগেই এই সিদ্ধান্ত হলে তা কূটনৈতিক ও কৌশলগত - দু’দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে প্রতিরক্ষা মহল।
এই চুক্তি কার্যকর হলে শুধু আর্থিক দিক থেকেই নয়, প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে প্রায় ১০০টি রাফাল যুদ্ধবিমান ভারতে উৎপাদনের (Make In India) বন্দোবস্ত থাকছে। তার ফলে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (Make In India) কর্মসূচিকে আরও শক্ত ভিত দেওয়াই এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমানে ভারতীয় বায়ুসেনার (Indian Air Force) হাতে রয়েছে ৩৬টি রাফাল ‘সি’ ভ্যারিয়েন্ট। শেষ বিমানটির ডেলিভারি হয়েছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। এর পাশাপাশি ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ২৬টি রাফাল ‘এম’ ভ্যারিয়েন্ট কেনার চুক্তিও ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা। ওই চুক্তির আওতায় চারটি টুইন-সিটার প্রশিক্ষণ বিমান, রক্ষণাবেক্ষণ, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং কর্মী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
নৌবাহিনীর রাফাল ‘এম’ যুদ্ধবিমানগুলি মোতায়েন করা হবে আইএনএস বিক্রান্ত (INS Vikrant) এবং আইএনএস বিক্রমাদিত্য (INS Vikramaditya) বিমানবাহী রণতরীতে। অন্যদিকে, বায়ুসেনার রাফাল ‘সি’ স্কোয়াড্রন দুটি ভাগে মোতায়েন হবে - আম্বালার ১৭ নম্বর স্কোয়াড্রন ‘গোল্ডেন অ্যারোজ’ এবং উত্তরবঙ্গের হাসিমারায় ১০১ নম্বর স্কোয়াড্রন ‘ফ্যালকনস’।
যুদ্ধক্ষেত্রেও ইতিমধ্যেই নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে রাফাল। গত বছর মে মাসে জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার (Jammu Kashmir Pahalgam Attack) পর ভারতের সামরিক প্রত্যুত্তর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ (Operation Sindoor) অংশ নেয় এই যুদ্ধবিমান। লাদাখেও রাফালের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই অভিযানে রাফাল থেকে ছোড়া হয়েছিল স্ক্যাল্প ক্রুজ মিসাইল, যা ২৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের শক্তপোক্ত লক্ষ্যবস্তু নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম। মিটিওর এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল, হ্যামার স্ট্যান্ড-অফ অস্ত্র এবং স্পেকট্রা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম - সব মিলিয়ে রাফালকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মাল্টি-রোল ফাইটার জেটগুলির মধ্যে ধরা হয়।
এর মধ্যেই গত বছর জুনে ভারত ও ফ্রান্স চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও উৎপাদন হস্তান্তর চুক্তির কথা ঘোষণা করেছে। দাঁসোর অ্যাভিয়েশন এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের যৌথ উদ্যোগে হায়দরাবাদে অত্যাধুনিক উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। সেখানে রাফালের রিয়ার ফিউজলাজ, সেন্ট্রাল ফিউজলাজ এবং সামনের অংশের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো তৈরি হবে।
২০২৮ সাল থেকে প্রথম ফিউজলাজ অংশ উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। প্রতি মাসে দু’টি সম্পূর্ণ ফিউজলাজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যদিও চূড়ান্ত সংযোজন হবে ফ্রান্সের বোর্দোর কাছে দাঁসোর কারখানাতেই।
এই আবহেই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনী দেশীয় পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনাও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ডিআরডিও-র অধীনে তৈরি হতে চলা এই টুইন-ইঞ্জিন, ডেক-ভিত্তিক যুদ্ধবিমানগুলি বায়ুসেনার এএমসিএ প্রকল্পের নৌ সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে, রাফাল চুক্তি শুধু বর্তমান নয়, ভারতের ভবিষ্যৎ আকাশ প্রতিরক্ষার দিশাও নির্ধারণ করে দিচ্ছে।