
শেষ আপডেট: 5 December 2023 11:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত জুন মাসে নিষিদ্ধ সংগঠন খালিস্তান টাইগার ফোর্সের নেতা হরদীপ সিংহ নিজ্জরকে কানাডার পশ্চিম প্রান্তের প্রদেশ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার গুরুদ্বারের সামনে গুলি করে খুন করা হয়েছিল। তিন মাস পরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো অভিযোগ তুলেছেন, নিজ্জরের খুনে ভারতের ‘এজেন্ট’-দের হাত রয়েছে। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’-কে এর জন্য দায়ী করা হয়েছিল। এরপরেই কানাডার বিদেশ মন্ত্রক সে দেশে ভারতীয় কূটনীতিক হিসেবে নিযুক্ত পবন কুমার রাইকে কানাডায় র’-এর ‘স্টেশন চিফ’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সংবাদসংস্থা ‘দ্য প্রিন্ট’ তাদের গবেষণামূলক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, আমেরিকা-কানাডায় ধীরে ধীরে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার দরজা বন্ধ হচ্ছে। একের পর এক দেশে ফিরে যেতে বলা হচ্ছে ‘র’ এর অফিসারদের।
চলতি বছরের গোড়ায় ওয়াশিংটনের র স্টেশ চিফ অফিসারকে দেশে ফিরে যেতে বলা হয়। প্রাক্তন প্রধান সামান্ত গোয়েল ৩০ জুন অবসর নেওয়ার পরে নতুন কাউকে নিয়োগই করা হয়নি। কানাডার র-এর স্টেশন চিফ অফিসার পবন রাই যাকে দেশে পাঠিয়ে দেয় কানাডা বিদেশমন্ত্রক, তিনি এককথায় ছিলেন ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার দাবাং অফিসার। নিজ্জরকে হত্যার পিছনে ‘র’-এর দক্ষ অফিসারদের পরিকল্পনা ছিল বলেই অভিযোগ করে কানাডার বিদেশমন্ত্রক। ভারত যদিও কানাডার অভিযোগ স্বীকার করেনি, প্রশ্ন তোলে, নিজ্জরের নামে ‘রেড কর্নার নোটিস’ থাকা সত্ত্বেও কানাডা কেন তাকে নাগরিকত্ব দিয়েছিল।
দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সান ফ্রান্সিসকো ও ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘র’ এর স্টেশনগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। লন্ডনেও ভারতের গুপ্তচর সংস্থার অফিসে নতুন কাউকে নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রাক্তন অফিসারকে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। ওই কর্মকর্তারা পরিচয় গোপন করে কাজ করছিলেন না।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, শিখস ফর জাস্টিস প্রধান গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে আমেরিকায় হত্যা করার ছক কষা হয়েছিল। তা নিয়ে ভারতকে সতর্ক করেছে আমেরিকা। ওয়াশিংটনের তরফ থেকে নাকি জানানো হয়, সেই হামলার ছকে দিল্লির যোগ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। গত অগস্ট সৌদি রাজধানীতে এই ইস্যুতে নাকি মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সালিভান এবং ভারতের জাতীয় নিরপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের কথা হয়েছিল। সেই সময় নাকি মার্কিন এনএসএ ডোভালকে বলেছিলেন, এই ধরনের ঘটনা আমেরিকা বরদাস্ত করবে না। পাশাপাশি ভারত যাতে এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটায়, তা নিয়ে প্রতিশ্রুতিও চাওয়া হয়।
দ্য প্রিন্ট-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, আশির দশক থেকেই খালিস্তানি জঙ্গিদের নিয়মিত ভাবে অস্ত্রশস্ত্র জোগাতে শুরু করেছিল পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। শিখ দেহরক্ষীদের হাতে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। তিনি ভারতের গুপ্তচর সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং ‘র’-এর কর্তাদের পুরোপুরি দায়িত্ব ছিলেন অপরাধীদের খুঁজে খুঁজে মারতে। দুটো দলও তৈরি হয়েছিল-- ‘টিম এক্স’ ও ‘টিম জে’। এই দুই দলের কাজ কী হবে তা অতি গোপনে স্থির করা হত। প্রথম দলের কাজ ছিল, খালিস্তানিদের মদতের জবাবে পাকিস্তানকে পাল্টা মার দেওয়া। আইএসআই-এর হ্যান্ডলারদের খুঁজে খুঁজে সাজা দেওয়া। আর দ্বিতীয় দলটির কাজ ছিল খালিস্তানি জঙ্গি নেতাদের নিশানা করা। এই খালিস্তানি জঙ্গি নেতারা যে যে দেশে ছড়িয়ে আছে সেখানে গিয়ে তাদের নিকেশ করা। সে সময় লাহোরে খালিস্তানপন্থী অনেক নেতাকে গোপনে ‘শাস্তি’ দিয়েছিলেন ‘র’-এর এজেন্টরা।
নিজ্জরের নাম নিহতের তালিকায় প্রথম নয়। গত এক বছরে একের পর খালিস্তানি জঙ্গি সংগঠনের নেতারা কেউ পাকিস্তানে, কেউ ব্রিটেনে রহস্যজনক ভাবে খুন হয়ে গিয়েছে। এরপরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পরে যে র টিম সক্রিয় হয়েছিল, তারা কি আবার ফিরে এল!
কানাডায় খালিস্তানি নেতা হত্যার পরে ভারতের দিকেই সরাসরি অভিযোগের আঙুল তোলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। দুই দেশের সম্পর্কও তলানিতে নেমে আসে। দুই দেশে অবস্থিত দূতাবাস থেকে একে অন্যের গোয়েন্দা অফিসারকে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা আপাতত বন্ধ। ভারত কানাডার নাগরিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছে। ভারতে কানাডার দূতাবাসে কর্মরত বাষট্টি জন কূটনীতিকের মধ্যে একচল্লিশ জনকেই ফিরে যেতে বাধ্য করেছে।