
নিজস্ব ছবি
শেষ আপডেট: 8 February 2025 18:40
লোকসভা ভোট এলেই দিল্লিতে বিজেপির ভোট চোঁ চোঁ করে বেড়ে যায়। অথচ বিধানসভা নির্বাচনে (Delhi Election) সেই ভোটেরই একটা অংশ হড়পা বাণের মতো চলে যায় অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দিকে। পর পর দু’বার এরকম ঘটেছে। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, জগৎপ্রকাশ নাড্ডারা কোনওভাবেই তা আটকাতে পারেননি। কোনও না কোনওভাবে মোদী-শাহ-বিজেপি মোহমায়ার দঁড়ি ছিঁড়ে তারা বেরিয়ে গেছে। তাতেই পুষ্ট হয়ে কেজরিওয়াল ২০১৫ এবং ২০২০ সালে বেইজ্জত করে ছেড়েছেন বিজেপিকে। নরেন্দ্র মোদীর নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে বিজেপিকে দশ গোল দিয়েছিলেন আম আদমির ক্যাপ্টেন।
কিন্তু, এবার (Delhi Assembly election in 2025) শুয়ে পড়ে সেই গোল বাঁচিয়ে দিল বিজেপি ও আরএসএস। কীভাবে ও কৌশলে তাঁরা সেই কাজটা করলেন সেটাই এই প্রতিবেদনের প্রতিপাদ্য।
তা বুঝতে গেলে অনেকটা পিছনে হাঁটতে হবে। আন্না আন্দোলনের পর অরবিন্দ কেজরিওয়াল যখন আম আদমি পার্টি গড়েছিলেন তা রাজনীতির কোনও বাধা গতে ঘটেনি। সেই ঘরানা ছিল এক্কেবারে নতুন। সে সময়ে নতুন এই পার্টি নিতান্ত কোনও রাজনৈতিক দল ছিল না। তা ছিল একটা ফেনোমেনন। একটা উন্মাদনা। রাজধানী দিল্লির ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিপুল সংখ্যক ভোটার একজন ছাপোষা, মধ্যবিত্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। যিনি উচ্চ শিক্ষিত। খড়্গপুর আইআইটি থেকে কারিগরী শিক্ষালাভ করেছেন। পরে আয়কর দফতরে কাজ করেছেন সততার সঙ্গে। তার পর নিরাপদ সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে নেমেছেন ‘জঞ্জাল সাফাই’ করতে। তার আগে দিল্লির মানুষ এমনটা শুধু সিনেমাতেই দেখেছিল।
তাই প্রচলিত রাজনীতির বেড়া ভেঙে কংগ্রেস ও বিজেপির বিপুল সংখ্যক সমথর্ক রাতারাতি ভোটার হয়ে যান আম আদমি পার্টির। তাঁদের ভোটেই পুষ্ট হয় আপ। তার আগে পর্যন্ত দিল্লিতে বাই-পোলার পলিটিক্স তথা দ্বিমেরু রাজনীতি ছিল। বিজেপি বনাম কংগ্রেস। কিন্তু এই দুই দলের ভোট ভাঙিয়ে এনে তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠেন কেজরিওয়াল। কংগ্রেসের বেশিরভাগ ভোট ধুয়ে চলে যায় আম আদমি পার্টির দিকে। তাদের ক্ষতি হয় বেশি। বিজেপিরও ক্ষতি হয়, তবে তুলনায় কম। এই ভোটারদের অনেকেই হয়তো তখন মনে করেন, আপ ছোট রাজনৈতিক দল। কেন্দ্রে সরকার গঠনে তাদের কোনও ভূমিকা থাকবে না। কিন্তু রাজ্যে তারাই সরকার চালাক। দিল্লি রাজ্যে অন্তত স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত সরকার চলুক।
সম্ভবত সেই কারণেই পর পর দু’জোড়া ভোটের ফলাফলে চরম বৈপরিত্য দেখা যায়। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে কেন্দ্রে একার ক্ষমতায় সরকার গঠন করে বিজেপি। দিল্লির ৭টি আসনেই তারা জিতে যায়। ভোট পায় ৪৬ শতাংশ। সেই ভোটে আপ পেয়েছিল ৩২ শতাংশ ভোট। কিন্তু পরের বছরই তথা ২০১৫ সালের বিধানসভা ভোটে ফলাফল উল্টে যায়। বিজেপির ভোট কমে হয় ৩২ শতাংশ। আর আপের ভোট বেড়ে হয় ৫৪ শতাংশ।
২০১৯ সালের ভোটে লোকসভা ফের দিল্লিতে স্যুইপ করে বিজেপি। ৭টি আসনে জিতে ৫৬ শতাংশ ভোট পায় তারা। আপ পায় মাত্র ১৮ শতাংশ ভোট। অথচ এক বছর পর বিধানসভা ভোটে ফের ডিগবাজি খায়। বিজেপির ভোট কমে হয় ৩৮ শতাংশ। আর আপের ভোট বেড়ে হয় ৫৩.৫৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের লোকসভা পুনরায় দিল্লিতে ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি।
এই পরিসংখ্যান এটা বোঝাতেই দেওয়া হল যে বিজেপি ও আপের একটা বড় অংশের ভোটার ‘কমন’ (common voter)। তারা লোকসভা ভোটে বিজেপিকে ভোট দেয়, কিন্তু বিধানসভায় ভোট দিয়েছিল আপকে।
মোদী-অমিত শাহরা তাঁদের সেই ভোটারদেরই এবার আপের দিকে যাওয়া যতটা সম্ভব আটকে দিয়েছেন। শনিবার দিল্লি ভোটের যে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে পাঁচ বছর আগে বিধানসভা ভোটের তুলনায় আপের প্রাপ্ত ভোট ঠিক ১০ শতাংশ কমেছে। ২০২০ সালে যা ছিল ৫৩.৫৭ শতাংশ। তা কমে এবার হয়েছে ৪৩.৫৫ শতাংশ।
এই যে আপের ১০ শতাংশ ভোট কমেছে তার মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ নিতে পেরেছে কংগ্রেস। আর প্রায় ৮ শতাংশ উদ্ধার করতে বা ধরে রাখতে সফল হয়েছে বিজেপি। রাহুল-সনিয়ার পার্টি ২০২০ সালের বিধানসভা ভোটে ৪.২৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এবার পেয়েছে ৬.৩ শতাংশ। আর বিজেপি ২০২০ সালের বিধানসভা ভোটে ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কিন্তু এবার পেয়েছে ৪৬ শতাংশ ভোট।
কৌতূহলের বিষয় হল, কীভাবে সেটা করতে পারল বিজেপি?
দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, বিজেপির এই ভোটাররা একেবারেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোট। আর্থিক ভাবে অনগ্রসর শ্রেণির ভোট নয়। কেজরিওয়ালের সততা ও নিষ্ঠার মোড়ক দেখে মধ্যবিত্তদের ভোটারদের এই অংশ আচ্ছন্ন হয়ে ছিলেন। এবার আরএসএসের স্বয়ংসেবক ও বিজেপির কর্মীরা ভোটার লিস্ট ধরে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন। যাকে বলা হচ্ছে, ‘শুয়ে পড়ে গোল বাঁচানো।’ অর্থাৎ মাইক্রোম্যানেজ করেছে বিজেপি।
তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কেজরিওয়ালের সবটাই ভেক। তিনি দুর্নীতিমুক্ত নন। বরং মুখ্যমন্ত্রী ও উপ মুখ্যমন্ত্রী দীর্ঘ সময় দুর্নীতির অভিযোগে জেল হেফাজতে ছিলেন। শুধু তা নয়, আম আদমির স্বার্থের কথা বলে যিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, তিনি এখন খাসমহলে থাকেন। তাঁর সরকারি বাড়ি মেরামত করে শিসমহল বানানো হয়েছে। এর জন্য সরকারি কোষাগার থেকে খরচ হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। তাঁরা এও দেখেছেন যে, কেজরিওয়াল গত দশ বছর ধরে স্রেফ কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে ঝগড়া করে গেছেন। দিল্লির উন্নতির কাজ এতে থমকে গেছে। মধ্যবিত্তরদের এই অংশকে ধরে রাখতে হয়তো বাজেটে ঘোষণা করা আয়করে বিপুল ছাড়ও কিছুটা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। এবং তার ফল পেয়েছে বিজেপি।
বিজেপি নেতারা এও স্বীকার করছেন যে আর্থিক ভাবে অনগ্রসর, নিম্নবিত্ত, গরিব ও সংখ্যালঘু ভোট এই নির্বাচনেও কেজরিওয়ালের সঙ্গে অধিক সংখ্যায় ছিল। বিদ্যুৎ বিল ও জল করে ছাড়, বিনা টিকিটে সরকারি বাসে সফর ইত্যাদির মতো প্রকল্প চালু করে যে উপভোক্তা শ্রেণি কেজরিওয়াল তৈরি করেছিলেন, তাদের বেশিরভাগই আপকে ভোট দিয়েছেন। তাই দিনের শেষে আপ ৪৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে। যা খুব একটা কম নয়। বিজেপির সঙ্গে তাদের ভোটের ফারাক মাত্র ৩ শতাংশ। তাতেই আসন সংখ্যায় বিস্তর ফারাক হয়ে গেছে।