
সমাধিক্ষেত্রটি ছিল নীল আকাশের নীচে এবং মাটির সবুজ ঘাসের উপর বিছানো।
শেষ আপডেট: 18 March 2025 13:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মৃত্যুর আগেই নিজের সমাধির ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কুখ্যাত নায়ক। নমাজ পড়ার ফেজ তৈরি করে এবং নিজের হাতে কোরান লিখে বিক্রি করে যা আয় হতো, তা দিয়ে ব্যক্তিগত খরচ চালাতেন। এবং ফকিরদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। সেই 'শেষ' মুঘল সম্রাটের সমাধি ধ্বংসের জন্য উতলা হয়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। মহারাষ্ট্রের সম্ভাজিনগরের খুলদাবাদে রয়েছে ঔরঙ্গজেবের অতি সাধারণ ছিমছাম সমাধি। বর্তমানে যে মার্বেলে বাঁধাই করা সাদা পাথরের জাফরি কাটা সমাধিটি রয়েছে, তা তৈরি করা হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। কারণ, ঔরঙ্গজেবের 'ইচ্ছাপত্র' অনুযায়ী তাঁর সমাধিক্ষেত্রটি ছিল নীল আকাশের নীচে এবং মাটির সবুজ ঘাসের উপর বিছানো।
সেই সমাধিকে সম্প্রতি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিলেন রাজ্যের সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক আবু আজমি। ঔরঙ্গজেব সুশাসক ও অত্যাচারী সম্রাট ছিলেন না বলা নিয়ে আগুনের ফুলকি জ্বলে ওঠে প্রথম। কারণ মারাঠা জাতের স্বাভিমানের অন্যতম কেন্দ্রস্থল শিবাজি মহারাজ ও তাঁর বাঘের বাচ্চা (ছাবা) পুত্র সম্ভাজি মহারাজের উপর ঔরঙ্গজেবের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনীর লাগাতার হামলা-অত্যাচারের ইতিহাস আজও মশালের মতো জ্বলছে মহারাষ্ট্র তথা উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মনে। আর তাই উত্তরপ্রদেশের একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বাবরি মসজিদের ধাঁচে ঔরঙ্গজেবের সমাধি ধ্বংসের জন্য ২১ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। এর পিছনেও রয়েছে মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের সরাসরি সমাধি সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে মন্তব্য।
কেন বিতর্ক, কী দাবি হিন্দুত্ববাদীদের?
উত্তরপ্রদেশের শ্রীকৃষ্ণ জন্মভূমি সংঘর্ষ ন্যাস-এর প্রধান ফতোয়া দিয়ে বলেছেন, মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। হিন্দু মহিলাদের উপর অত্যাচার করেছিলেন। মারাঠা যোদ্ধাদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলেন। এরপরেও কী কারণে তাঁর সমাধি এদেশে সুরক্ষিত রাখা থাকে? আমার দাবি ঔরঙ্গজেবের সমাধি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হোক। যে ওই সমাধির উপর দিয়ে বুলডোজার চালাতে পারবে, তাকেই আমাদের সংগঠন ২১ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেবে। শুধু সম্ভাজিনগর কেন, ভারতে কোথাও যেন ঔরঙ্গজেবের সমাধি না থাকে, এই দাবি তুলেছেন তিনি।
শুধু এই সংগঠনই নয়, বজরং দল এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদও ঔরঙ্গজেবের সমাধি ধ্বংসের দাবিতে অশান্তি শুরু করেছে মহারাষ্ট্রে। যার জেরে নাগপুরে কার্ফু জারি করতে হয়েছে। জখম হয়েছেন বেশ কয়েকজন। মঙ্গলবার সকালেও এলাকায় এলাকায় উত্তেজনা রয়েছে। সম্প্রতি কোলাপুরে বজরং দল একটি প্রতীকী ঔরঙ্গজেবের সমাধি তৈরি করে হাতুড়ি দিয়ে তা ভেঙে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখিয়েছিল। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ঔরঙ্গজেবের প্রতীকী সমাধিও আমাদের কাছে যখন চক্ষুশূল, তখন কেন সত্যি সমাধিটি মহারাষ্ট্রে থাকবে। সরকারের উচিত এখনই ওটা সরিয়ে দেওয়া। এই একই দাবি উঠেছে খোদ সম্ভাজিনগর (অতীতের ঔরঙ্গাবাদ), পুণে, নাসিক, নাগপুরে।
ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু ও সমাধি: ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সম্রাট
ঔরঙ্গাবাদ বা বর্তমানের সম্ভাজিনগরের কাছে খুলদাবাদে রাস্তার ধারে একেবারে অনাড়ম্বরভাবে রয়েছে ৫০ বছরের কাছাকাছি সময় অর্ধেক ভারত শাসন করা ঔরঙ্গজেবের সমাধি। আকবর, হুমায়ুনের বড়সড় বিশাল তো নয়ই, তাজমহলের কাছে একেবারে নস্যি এই সমাধিক্ষেত্র। কারণ মৃত্যুর আগেই ঔরঙ্গজেব স্বয়ং তাঁর উইলে এখানেই গোর দেওয়ার কথা লিখে রেখে গিয়েছিলেন। জায়গাটি সুফি সাধক শেখ জৈনুদ্দিনের দরগা ছিল। ঔরঙ্গজেব সুন্নি সম্প্রদায়ের হলেও সুফি সাধক জৈনুদ্দিনের আদর্শ ও উপদেশ মেনে চলতেন।
দক্ষিণ ভারতে বিকল্প একটি রাজধানী পত্তনের স্বপ্নে মশগুল ঔরঙ্গজেব সিংহাসন দখলের পর থেকে দাক্ষিণাত্য অভিযানে নেমে পড়েন। কিন্তু এই অভিযানে বিপুল বৈভব ও প্রতাপশালী মুঘল বাহিনীর বাধা হয়ে দাঁড়ান মারাঠা যোদ্ধারা। শিবাজির নেতৃত্ব আকারে-ক্ষমতায় ক্ষুদ্র হলেও মারাঠারা রুখে দাঁড়ায় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। শিবাজির সুকৌশলী গেরিলা যুদ্ধে নাকাল হয়ে বারবার পিছু হটতে বাধ্য হন ঔরঙ্গজেব। অবশেষে তিনি নিজে মারাঠা দখলে রওনা দেন।
১৭০৫ সাল নাগাদ বিজাপুর গড় দখল করতে অনর্থক শক্তিক্ষয় করে ঔরঙ্গজেব বয়স, রোগভোগ ও যুদ্ধক্লান্ত হয়ে ঘোরতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাঁর বয়স ৮৬ বছর। তিনি দিল্লি প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেও পথে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিজাপুরে কৃষ্ণা নদীর তীরে দেবাপুরে পৌঁছে ঔরঙ্গজেব একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ১৭০৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সেখানেই বিশ্রাম নেন। পরের বছর জানুয়ারিতে আবার ফেরার চেষ্টা শুরু করলে আহমেদনগরে এসে গুরুতরভাবে ভেঙে পড়েন। শেষ একটি বছর এখানেই ছিলেন ঔরঙ্গজেব। তাঁর ছেলে-মেয়ে কেউ কাছে ছিল না। তাঁর বিদ্রোহী পুত্র আকবরের মৃত্যু হয়েছিল পারস্যে ১৭০৪ সালে। এক মেয়ে দুবছর আগে মারা গিয়েছেন। তাঁর বোনের ততদিনে মৃত্যু হয়েছে।
ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু যখন ঘনিয়ে এসেছে তখনও তিনি দিনে পাঁচবার নমাজ পড়েছেন। তাঁর পরামর্শদাতারা বোঝায়, শয়তানের নজর ও নরকের দূতদের দূরে হটিয়ে রাখতে সম্রাট যেন একটি হাতি ও মূল্যবান হিরে-জহরত দান করেন। কিন্তু ঔরঙ্গজেব তা করতে রাজি হননি। তার বদলে তিনি সেই আমলে একটি হাতির দাম হিসেবে রাজকোষ থেকে চার হাজার টাকা প্রধান কাজিকে দিয়ে বলেন, গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে। ঔরঙ্গজেবের নির্দেশ ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর সবথেকে কাছে যে গোরস্তান পড়বে সেখানেই তাঁকে ভূমিশয্যায় তাঁকে শায়িত করতে। কফিন যেন না রাখা হয়।
ঔরঙ্গজেবের শেষ ইচ্ছাপত্র
মৃত্যুর আগে একটি উইলে তাঁর শেষদিন এবং কবরস্থ করার সব ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন ঔরঙ্গজেব। রাজত্ব সব পুত্রদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন, যাতে কোনও অশান্তি না বাধে। উইলে লিখে গিয়েছিলেন, তাঁর সর্বক্ষণের পার্শ্বচর তথা পরিচারক আইয়া বেগের কাছে তাঁর টাকার থলি রয়েছে। তাতে চার টাকা ২ আনা পাবে। ওই টাকা আমি ফেজ তৈরি করে আয় করেছি। উল্লেখ্য, ঔরঙ্গজেব ফেজ বুনে ও কোরান লিখে নিজের খাবার খরচ চালাতেন, বেঁচে যাওয়া অর্থ বিলিয়ে দিতেন গরিবদের মধ্যে। তাঁর জীবনধারণের জন্য কোনও অর্থ রাজকোষ থেকে নেননি। এই হতভাগ্য লোকটির জন্য ওই টাকা কফিন কিনতে খরচ করো। এছাড়াও বটুয়ায় আরও ৩০৫ টাকা পাবে। ওই টাকা আমি কোরান লিখে বিক্রি করে আয় করেছি। আমার মৃত্যুর দিন ওই টাকা ফকিরদের দিয়ে দিও। এই টাকা আমার কফিন তৈরি কিংবা অন্য কোনও কাজে খরচ করো না।
ঔরঙ্গজেবের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর শায়িত দেহের মাথা খোলা ছিল আকাশের দিকে মুখ করা। শুধুমাত্র একটি সাদা চাদরে ঢাকা হয়েছিল কফিন। কোনও আড়ম্বর, বাজনদার ছাড়াই তাঁকে গোরস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁর স্বপ্ন মতোই ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৭০৭ সালের শুক্রবার সকাল ৮টা নাগাদ তাঁর কাঁপতে থাকা আঙুলের নড়াচড়া চিরকালের জন্য থেমে যায়। ইতিহাসে ঔরঙ্গজেবের কলঙ্কিত নায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলেও একমাত্র তিনিই সেই সম্রাট ছিলেন যাঁর কোনও খোশামুদে সভাসদদল ছিল না। কবি, ঐতিহাসিক, বিদূষকের মতো তোষামোদকারী দল ছিল না। তাঁদের মূল্যবান পুরস্কার, কিংবা নিষ্কর জমি দান করতেন না। কারণ, অনর্থক নিজের প্রশংসা শুনতে অপছন্দ করতেন। ঔরঙ্গজেব প্রথম সম্রাট যিনি দেশে মদ, যৌন ব্যবসা ও মাদক ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছিলেন। ঐতিহাসিক শ্রী শর্মা লিখেছেন, আকবরের আমলে ১৪ জন হিন্দু মনসবদার ছিলেন। যেখানে ঔরঙ্গজেবের আমলে প্রশাসনের শীর্ষে কর্মরত ১৪৮ জন হিন্দু ছিলেন।
সকলেই জানেন ব্রিটিশ রাজশক্তি রামমোহন রায়ের চাপে সতীদাহ প্রথার মতো হিন্দু সমাজের মধ্যযুগীর বর্বর প্রথা নিষিদ্ধি করেছিল। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, ১৬৬৬ সালে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব হুলিয়া জারি করে মৃত স্বামীর সঙ্গে বিধবা স্ত্রী সহগমন বন্ধ করেছিলেন। যাকে তৎকালীন হিন্দু সমাজ হিন্দু বিরোধী বলে গাল পেড়েছিল। সেই ঔরঙ্গজেবের সমাধিতে সে কারণেই লেখা থাকতে পারে, ঐশ্বর্যশালী মানুষ তাদের কবরের গম্বুজ সোনা-রুপো দিয়ে তৈরি করতেই পারেন, কিন্তু আমার মতো গরিব মানুষের কবরের মাথার উপর সেরা আচ্ছাদ্দন হল খোলা আকাশ।