এটি শ্রমিকের জন্য ‘নতুন রাস্তা’, নাকি মালিকদের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা তুলে দেওয়ার বিল?

প্রতীকী ছবি।
শেষ আপডেট: 22 November 2025 07:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুক্রবার থেকে কার্যকর হল দেশের বহু আলোচিত চার শ্রমবিধি (Four Labour Codes implemented in India)। দীর্ঘ টানাপড়েনের শেষে নরেন্দ্র মোদী সরকারের নির্দেশে শ্রম মন্ত্রক জানিয়ে দিল—এ দিন থেকেই দেশে চালু হচ্ছে নয়া শ্রম কাঠামো। সংসদে মজুরি বিধি পাশ হয়েছিল ২০১৯ সালে, আর শিল্পক্ষেত্রে সম্পর্ক, সামাজিক সুরক্ষা ও পেশাগত সুরক্ষা–স্বাস্থ্য–কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত আরও তিনটি বিল পাশ হয় ২০২০ সালে। বছরের পর বছর অপেক্ষার পর অবশেষে বাস্তব প্রয়োগের মঞ্চে উঠল নতুন শ্রমবিধি।
কেন্দ্রের দাবি, স্বাধীনতার পর এটাই দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমসংস্কার। এক ঝটকায় বাতিল করা হয়েছে ৪৪টি পুরনো শ্রমআইনের মধ্যে ১৫টি ‘অপ্রাসঙ্গিক’ আইন। বাকি ২৯টি আইনকে সংহত করে আনা হয়েছে চার শ্রমবিধির আওতায়। শ্রম মন্ত্রকের যুক্তি—দেশে শ্রম আইনকে আনা হচ্ছে আধুনিকতার পরিমাপে, কর্মক্ষেত্রকে করা হচ্ছে সময়োপযোগী, শ্রমিক সুরক্ষা আরও বাড়বে, একই সঙ্গে ব্যবসাও হবে ‘আরও সহজ’ (Ease of Doing Business)।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কথায়, “স্বাধীনতার পরে এটিই সবচেয়ে প্রগতিশীল শ্রম সংস্কার। এতে শ্রমিকদের ক্ষমতা বাড়বে এবং ব্যবসা হবে সহজ।” কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সামাজিক মাধ্যমে একে অভিহিত করেছেন “শ্রম আইনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ” বলে।
কিন্তু সংস্কারের ঢেউয়ের সঙ্গে উঠেছে প্রবল বিরোধিতার ঝড়ও। শ্রমিক সংগঠনগুলির অভিযোগ—এটি শ্রমিকের সুরক্ষা নয়, শোষণ বাড়ানোর নকশা। বিশেষ করে যে বিধিতে বলা হয়েছে, ৩০০-র কম কর্মী থাকলে কোনও সংস্থা সরকারকে না জানিয়েই শিল্প বন্ধ বা ব্যবসাপত্র তুলে নিতে পারবে, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়বে, অযৌক্তিক বরখাস্ত বা সাসপেনশনের আশঙ্কাও তীব্র হবে।
পাশাপাশি ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’ কার্যকর হওয়ার ন্যূনতম কর্মীসংখ্যা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ করা নিয়েও শ্রমিক সংগঠনগুলি ক্ষুব্ধ। তাদের বক্তব্য—এতে মালিক পক্ষ সুবিধা পাবে, শ্রমিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—এই শ্রমবিধি কি সমগ্র দেশে কার্যকর? উত্তর, না। সংবিধান অনুযায়ী শ্রম সংক্রান্ত বিষয় যুগ্ম তালিকার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কেন্দ্র যেমন আইন করতে পারে, তেমন রাজ্যও পারে। ফলে রাজ্যের অনুমতি ছাড়া নতুন বিধি কার্যকর নয়।
এখানেই স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসির সভাপতি এবং সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি বলেছেন, “এটি শ্রমিকস্বার্থ বিরোধী। শ্রমিক শোষণ বাড়বে। তাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রুল ফ্রেম করেনি।”
বামপন্থী শ্রম সংগঠন সিটু আরও এক ধাপ এগিয়ে অভিযোগ তুলেছে—“আলোচনার দরজা বন্ধ রেখে ফ্যাসিবাদী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে কেন্দ্র। সংঘাতই আমাদের পথ।” যদিও বিজেপি অনুগত শ্রম সংগঠন ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে চার শ্রমবিধি কার্যকর হওয়ার পর দেশজুড়ে শ্রমক্ষেত্রে সূচনা হল নতুন অধ্যায়ের। প্রশ্ন একটাই,
এটি শ্রমিকের জন্য ‘নতুন রাস্তা’, নাকি মালিকদের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা তুলে দেওয়ার বিল?