মঙ্গলবার মৃতদেহ তুলে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। দেহটি তুলতেই তার পাশে বসে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেন মহিলা। এই মর্মান্তিক ঘটনা দেখে চোখে জল ধরে রাখতে পারেনি সেখানে উপস্থিত অন্যান্যরাও।

ঘটনাস্থলের ছবি
শেষ আপডেট: 24 May 2025 19:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি,' কাঙালের ধন শুধু চুরি হল, তা নয়, যেটুকু ছিল সেই সম্বলটুকুও মিলিয়ে গেল পঞ্চভূতে। এমন নৃশংস ঘটনার নিদর্শন ইতিহাসের পাতায় থাকলেও বাস্তবে আজকাল দেখা যায় না খুব-বেশি। তাই অন্ধ্রপ্রদেশের এই ঘটনা বিরল।
অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুপতি। এক হাঁস পালকের বাড়িতে সামান্য পারিশ্রমিকে কাজ করতেন এক পরিবার। এক জনজাতি দম্পতি ও তাঁদের তিন সন্তান। কাজ করতে করতেই জনজাতি ব্যক্তি অর্থাৎ চেঞ্চাইয়ার মৃত্যু হয়। তারপর অনাক্কাম্মা তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আবেদন জানান। কিন্তু তাঁদের কোনওভাবেই কাজ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেননি ওই হাঁস পালক।
অনাক্কাম্মাকে জানানো হয়, তাঁর স্বামী ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। তাই বিনিময়ে তাঁদের কাজ করতে হবে। দীর্ঘদিন সামান্য পারিশ্রমিকে কাজ করার পর তাঁরা অব্যহতি চান। কিন্তু জানানো হয়, ২৫ হাজার টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার পরই অব্যহতি পাওয়া যাবে। মহিলা জানান, তিনি কিছুদিনের মধ্যেই ২৫ হাজার টাকা ফিরিয়ে দেবেন। ওই হাঁস পালক তখন শর্ত দেন, টাকা যতদিন না ফেরানো হচ্ছে, ততক্ষণ এক ছেলেকে বন্দক হিসেবে রেখে যেতে হবে। তাই করেন তিনি।
ছেলেটির সঙ্গে মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলতেন অনাক্কাম্মা। প্রতিবারই ছেলে কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করত, জানাত যে তাঁকে অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে। শেষবার ১২ এপ্রিল ছেলের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এরপর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে অনাক্কাম্মা সুদের টাকা সহ ৪৫ হাজার টাকা জোগাড় করেন এবং ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে হাঁস পালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
প্রথমে ওই ব্যক্তি জানান, ছেলে অন্য কোথাও চলে গেছে, পরে বলেন হাসপাতালে ভর্তি, আর শেষ পর্যন্ত জানান যে ছেলে পালিয়ে গেছে। এই কথাবার্তায় সন্দেহ হওয়ায় অনাক্কাম্মা স্থানীয় কিছু উপজাতি সংগঠনের সাহায্যে পুলিশের দ্বারস্থ হন। পুলিশ টিম গঠন করে এবং হাঁস পালককে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে স্বীকার করে যে ছেলেটির মৃত্যু হয়েছে এবং তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমে গোপনে দেহ কবর দেওয়া হয়েছে।
এরপর পুলিশ হাঁস পালক, তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেকে গ্রেফতার করে। সোমবার তাদের বিরুদ্ধে বন্ডেড লেবার সিস্টেম (অবলিশন) আইন, চাইল্ড লেবার অ্যাক্ট, জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট, এসসি/এসটি অ্যাট্রোসিটিস অ্যাক্ট এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা-র বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা হয়।
মঙ্গলবার মৃতদেহ তুলে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। দেহটি তুলতেই তার পাশে বসে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেন মহিলা। এই মর্মান্তিক ঘটনা দেখে চোখে জল ধরে রাখতে পারেনি সেখানে উপস্থিত অন্যান্যরাও। তিরুপতির কালেক্টর ভেঙ্কটেশ্বর জানান, তাঁরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
তাঁর কথায়, 'আমাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হাঁস পালকের পরিবার বলছে, সে জন্ডিসে মারা গেছে। কিন্তু গোপনে দেহ কবর দেওয়া হয়েছে এবং পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। এটাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়।'
সমাজকর্মীদের মতে, ইয়ানাদি উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষজন খুব সহজেই বন্ডেড লেবারের ফাঁদে পড়ে যান। সম্প্রতি ওই সম্প্রদায়ের ৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। সাধারণত, কিছু অগ্রিম টাকা দিয়ে তাঁদের ফাঁদে ফেলা হয় বলে জানান এক স্বেচ্ছাসেবী।
এই ঘটনার তদন্ত চলছে জোরকদমে। প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।