১১৪ বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন ‘পাগড়িওয়ালা টর্নেডো’ ফৌজা সিং। এই বয়সেও ম্যারাথন দৌড়তেন তিনি। কী ছিল তাঁর দীর্ঘজীবনের মূল রহস্য?

ফৌজা সিং।
শেষ আপডেট: 16 July 2025 18:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৪ জুলাই ২০২৫। পাঞ্জাবের জলন্ধরের বিয়াস পিন্ড গ্রামে সকালের হাঁটাহাঁটি শেষে বাড়ি ফিরছিলেন ফৌজা সিং। রাস্তা পার হওয়ার সময় বেপরোয়া গতির একটি গাড়ি ধাক্কা মারে তাঁকে। মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। হাসপাতালে নিয়ে যাওওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয় ১১৪ বছর বয়সি এই দৌড়বীরের। সারা দেশ জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। ভারতের ক্রীড়া মহল থেকে সাধারণ মানুষ— সকলেই হারালেন এক জীবন্ত অনুপ্রেরণাকে।
ঘটনার দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে কানাডা প্রবাসী অমৃত সিং ধিলোঁকে। পুলিশ জানিয়েছে, গাড়িটি আগে বিক্রি হয়েছিল বারীন্দ্র সিং নামে এক ব্যক্তির কাছে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, দুর্ঘটনার সময় চালকের আসনে ছিলেন অমৃত। সিসিটিভি ফুটেজ ও গাড়ির নম্বর চিহ্নিত করেই গ্রেফতার করা হয় তাঁকে।
১৯১১ সালের ১ এপ্রিল জন্ম বিয়াস পিন্ড গ্রামে। শৈশবে এতটাই দুর্বল পা ছিল যে পাঁচ বছর পর্যন্ত হাঁটতেই পারতেন না। সবাই তাঁকে ডাকত 'ডান্ডা' বলে। যার অর্থ, লাঠি।
যৌবন বয়সে দেশভাগের সময়ে সবকিছু হারান তিনি। এরপর একে একে শোক-তাপে ভরতে থাকে জীবন। একে একে মারা যান স্ত্রী, মেয়ে, ছোট ছেলে। গভীর শোকে বারবার শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন তিনি। এক পর্যায়ে পরিবার তাঁকে পাঠায় ইংল্যান্ডে, ছেলের কাছে।
সেখানেই জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
৯০-এ পা দেওয়ার আগেই রানিং ক্লাবে ভর্তি হন ফৌজা। প্রথমে ছিল হবি, পরে এটাই জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। ২০০০ সালে লন্ডন ম্যারাথন দিয়ে শুরু। এরপর নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, হংকং, গ্লাসগো, মুম্বই— প্রতিটি ম্যারাথনে তাঁর উপস্থিতি শুধু খবরে নয়, সবার মনেও জায়গা করে নিয়েছিল।

১০০ বছর বয়সে টরন্টোতে ৮টি বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন একদিনে, ১০০ মিটার থেকে ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ে। ২০১২ সালে তিনি ছিলেন অলিম্পিক মশালবাহক। ২০১৩ সালে হংকং ম্যারাথনের পর প্রতিযোগিতামূলক দৌড় থামান। ততদিনে তাঁর বয়স ১০২!
ফৌজা সিং ছিলেন নিরামিষভোজী। নিয়মিত হাঁটতেন, দৌড়াতেন। নিজের ডায়েটের কথা বলেছিলেন তিনি। 'চাপাটি, ডাল, সবজি, দই, দুধ। পরোটা, পকোড়া, তেল-মসলা না। আদা দেওয়া চা, প্রচুর জল। আর প্রতিদিন ঈশ্বরের নাম নিয়ে ঘুমোই।' — এই ছিল তাঁর কথা।
তিনি নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, 'আমি বিশ্বাস করি, নিরামিষাশীরা মাংসাশীদের চেয়ে গড়ে ৬–১০ বছর বেশি বাঁচেন।'

শুধু নিরামিষ ডায়েট নয়, ফৌজা সিং শরীরচর্চাও করতেন নিয়মিত। ম্যারাথনের আগে দিনের পর দিন অনুশীলন করতেন। প্র্যাকটিস ছাড়া রেসে নামতেন না। এমনকি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত দৌড়ে যোগ দিতেন মাদকের বিরুদ্ধে প্রচারেও।
রানিং করে জীবনে যে অর্থ উপার্জন করেছেন, সবই দিয়েছেন চ্যারিটিতে। গুরদ্বারায় কোনও মানুষ হাতে টাকা দিলে সেটা তিনি সোজা দান বাক্সে দিয়ে দিতেন। তাঁর দানশীলতা, সরলতা, শিশুর মতো হাসি আর অতল প্রেরণা আজও ছুঁয়ে যাবে যে কোনও বয়সের মানুষকে।
তাঁর জীবনের উপর লেখা বই ‘Turbaned Tornado’-তে খুশবন্ত সিং লিখেছেন— 'আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাবা, মৃত্যুকে ভয় লাগে? তিনি বলেছিলেন, হ্যাঁ, খুবই ভয় লাগে। কারণ এই তো সবে আমার জীবনের মেলাটা শুরু হয়েছে!'
শতবর্ষ পেরিয়েও ফৌজা সিং বারবার দেখিয়ে দিয়েছেন, বয়স মানসিক ব্যাপার। যদি ইচ্ছা থাকে, শৃঙ্খলা থাকে, বিশ্বাস থাকে—তবে জীবন আবারও শুরু করা যায় সব হারানোর পরেও।

তাঁর প্রয়াণে শেষ হল একজন কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদের অধ্যায়। কিন্তু তিনি রেখে গেলেন এক জীবন্ত পাঠ, যেখানে তিনি শিখিয়েছেন, শরীর নয়, মনই আসল শক্তি।