
নরেন্দ্র বিক্রমাদিত্য যাদব
শেষ আপডেট: 9 April 2025 13:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মধ্যপ্রদেশের দামোর মিশন হাসপাতাল। ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখ একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসে। যেখানে দেখা যায় একজন ব্যক্তি, মুখচোখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, হাসপাতালে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। পাশে জাঁদরেল বাউন্সার। হাতে ধরা সুটকেস।
ইতিমধ্যে চাউর হয় ইকো মেশিন চুরি গেছে। থানায় তাই নিয়ে অভিযোগও দায়ের করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেই সূত্রেই ফুটেজ দেখে তদন্তে নেমে পড়ে পুলিশ। হাতিয়ার ভিডিও ফুটেজ।
সেই ক্লিপটি অনেক তত্ত্বতালাশ, খুঁটিয়ে দেখার পর পুলিশ দুইয়ে দুইয়ে চার করে। এবং বুঝে যায়: সর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে। ইকো মেশিনটি চুরি করেছিলেন যিনি, তিনি মিশন হাসপাতালেরই একজন চিকিৎসক!
এতদূর পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। গোটা ঘটনাটা একজন অসৎ চিকিৎসকের কুকর্ম বলে দাগিয়ে দেওয়াই যেত। কিন্তু এরপরই জানা যায় ওই চিকিৎসক, ডা. এন জন কাম, তাঁর সমস্ত ডিগ্রিই ভুয়ো৷ এমনকি নামটা পর্যন্ত জালি। আসল নাম নরেন্দ্র বিক্রমাদিত্য যাদব। সবার কাছে নিজের পরিচয় দিতেন লন্ডন-ফেরত কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে। দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে লেখাপড়া করেছেন বলেও দাবি করতেন। কিন্তু যাচাই-জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা যায়, তাঁর সমস্ত ডিগ্রি ভুয়ো।
এরপর চারের পর দুই যোগ করে ছয় দাঁড়ায় এবং বোঝা যায় কেন গত ৪৫ দিনে ১৫ খানা সার্জারি করা ‘ডাক্তার’ বিক্রমাদিত্যের হাতে সাত জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে!
আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের পর, ভুয়ো ডিগ্রি পরীক্ষার পর এবং যাদবের অপরাধ কবুলের পর তাঁকে আদালত পাঁচ বছর কারাবাসের সাজা শুনিয়েছে। সম্প্রতি তাঁকে কোর্ট থেকে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় চড়াও হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে। আর নিরাপত্তারক্ষীদের তোয়াক্কা না করেই তাঁর উপর চড়াও হন।
কিন্তু বিক্রমাদিত্য একা নন। জালি ডিগ্রি দেখিয়ে সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের গদি বাগিয়ে রোগীদের রোগনির্ণয় কিংবা সার্জারির কাজে নিযুক্ত আছেন ভূরি ভূরি চিকিৎসক। মধ্যপ্রদেশের এই বিতর্কিত কার্ডিওলজিস্ট তার একটি নমুনা মাত্র।
এই প্রসঙ্গে আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে গিয়েছে: কীভাবে গুচ্ছ গুচ্ছ ডিগ্রি, সেটাও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কলেজ থেকে, অর্জন করলেন বিক্রমাদিত্য? ডিগ্রিগুলি ভুয়ো হলে হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগের আগে কেন খুঁটিয়ে যাচাই করা হয়নি?
প্রসঙ্গত, গোটা ঘটনায় জড়িয়ে রয়েছে বাংলাও৷ কারণ, নরেন্দ্র যাদবের সার্টিফিকেট দেখার সময় পুলিশের নজর আসে, তাঁর এমবিবিএস ডিগ্রি নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজের! এমআরসিপি লন্ডনের সেন্ট জর্জ হাসপাতাল থেকে। পন্ডিচেরী থেকে কার্ডিওলজিতে ডিএম।
এই ডিগ্রিগুলি অবৈধ কি না, সেই বিষয়ে হাসপাতাল কিছু না জানালেও, সূত্রের খবর, তাঁর এমবিবিএস রেজিস্ট্রেশন নম্বর অন্য এক মহিলা চিকিৎসকের নামে নথিভুক্ত রয়েছে। বাকি কাগজপত্রের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে৷ এই নিয়ে সিনিয়র পুলিশ আধিকারিক সুকৃতি সোমবংশী বলেন, ‘ডিগ্রিগুলি জালি এবং বিকৃত৷ নরেন্দ্র যাদবের মোবাইল, ট্যাবলেট, এমনকী ইমেল পর্যন্ত ভুয়ো পরিচয়ে ভরা। আজ নয়। গত সাত কি আট বছর ধরে উনি মধ্যপ্রদেশ থেকেই কাজ চালিয়ে গেছেন। আমরা চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করে এই বিষয়ে ওঁর জ্ঞান কতদূর সেটা বোঝার চেষ্টা করছি।’
পুলিশ নরেন্দ্রর কারবারের মেয়াদ সাত-আট বছর বললেও সূত্রের খবর, এর বহু আগে থেকেই অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। ২০০৬ সালে ছত্তিসগড়ের অ্যাপোলো হাসপাতালের চিকিৎসক পদে ছিলেন। সেই সময়ও ছ'জন রোগী তাঁর ভুল সার্জারির জেরে প্রাণ হারান৷
মিশন হাসপাতাল বিতর্কের জেরে এখন নতুন করে উস্কে উঠেছে প্রশ্ন: কীভাবে জালি ডিগ্রি দেখিয়ে এতদিন অ্যাপোলোর মতো প্রথম শ্রেণির হাসপাতালে চিকিৎসা করে গেলেন নরেন্দ্র? কেন ন্যূনতম যাচাই পর্যন্ত হল না? উলটে বিদেশ-ফেরত চিকিৎসক হিসেবে তাঁকে প্রজেক্ট করে গেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ? দেশের একাধিক কলেজ থেকে পাওয়া জালি ডিগ্রিকে সম্বল করে সার্জেনের মতো পদে কীভাবে বহাল রয়েছেন নরেন্দ্র যাদবের মতো চিকিৎসক? এই প্রশ্নের মধ্যেই সম্ভবত দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার কঙ্কালসার চেহারার আসল রহস্য লুকিয়ে।