
ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় কীভাবে জড়িয়ে সনিয়া, রাহুল?
শেষ আপডেট: 12 April 2025 17:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ন্যাশনাল হেরাল্ড (National Herald) মামলায় আসোসিয়েটেড জার্নালস লিমিটেড (AJL) এবং ইয়ং ইন্ডিয়া (Young India) সংস্থার ৭০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (Enforcement Directorate) । শনিবার ইডি জানিয়েছে, বেআইনিভাবে আর্থিক লেনদেনের মামলায় এই পদক্ষেপ করতে চলেছে তারা।
ইডি জানিয়েছে, এই সম্পদের মধ্যে আছে দিল্লি, লখনউ এবং মুম্বইয়ে ন্যাশনাল হেরাল্ডের মালিক সংস্থা এজিএলের নামে থাকা জমি, বাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ অস্থাবর সম্পদ। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দিল্লিতে বাহাদুর শাহ জাফর মার্গে অবস্থিত ন্যাশনাল হেরাল্ড বিল্ডিং।
প্রসঙ্গত, ওই সম্পদ ২০২৩-এর নভেম্বর থেকে ইডির হেফাজতে রয়েছে। শনিবার কেন্দ্রীয় এজেন্সি জানিয়েছে তারা ওই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে।
ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকা ২০০৮ সাল থেকে ছাপা বন্ধ। ২০১৭ সালে পত্রিকাটির অনলাইন ভার্সন চালু হয়। ইংরিজির পাশাপাশি হিন্দিতে ‘নবজীবন’ এবং উর্দুতে ‘কউমি আওয়াজ’-এরও অনলাইন ভার্সন প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সালে জওহরলাল নেহরুর হাত ধরে চালু হওয়া ন্যাশনাল হেরাল্ড কংগ্রেসের রাজনৈতিক মতাদর্শকে পাথেয় করে চলে।
পত্রিকাটির মালিক এজিএল। সেই সংস্থার সঙ্গে ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ নামে সংস্থার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ঘিরে রাজনীতি এক সময় সরগরম হয়েছিল। বেআইনি পথে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পেয়ে তদন্ত শুরু করে ইডি। তদন্তে ওই সংস্থা প্রাক্তন দুই কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে এবং রাহুল গান্ধীকে তলব করে। অধুনা বন্ধ ন্যাশনাল হেরাল্ডের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। সম্পত্তির হাত বদলেই বেআইনি লেনদেন হয়েছে বলে ইডির অভিযোগ।
অন্যদিকে, কংগ্রেসের বক্তব্য, সম্পত্তির হাত বদল হলেও তাতে কোনও ধরনের অর্থ লেনদেন হয়নি। ফলে যে ক্ষেত্রে টাকা পয়সার লেনদেনই হয়নি, সেখানে বেআইনি কারবারের অভিযোগ ভিত্তিহীন। এই ব্যাপারে কংগ্রেস এবার আইনি লড়াই চালাবে। তবে কোনও সন্দেহ নেই ইডির সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন সনিয়া ও রাহুল গান্ধীর জন্য চাপের তেমনই কংগ্রেসের পক্ষে বড় ধাক্কা। ১৯৩৮ সালে এই পত্রিকার জন্মলগ্নে নেহরুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পাঁচ হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাদের অনুদানে তৈরি হয়েছিল অ্যাসোসিয়েটেড জার্নালস লিমিটেড। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি হাত বদলে বেআইনি লেনদেনের অভিযোগ শতাব্দী প্রাচীন দলটির জন্য অত্যন্ত অস্বস্তির।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০০৮ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার যখন ক্ষমতায় তখন দীর্ঘদিন আর্থিক সংকটে ভুগতে থাকা পত্রিকাগুলি বন্ধ হয়ে যায়। দু বছর পর জন্ম নেয় ইয়ং ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠানটি।
কংগ্রেস জানিয়েছে, ন্যাশনাল হেরাল্ডের মালিক আসোসিয়েটেড জার্নালস লিমিটেডকে ঋণমুক্ত করার জন্য আইনি প্রয়োজনে ইয়ং ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড গঠন করা হয়েছিল। সেই সংস্থার ৩৮ শতাংশ করে মোট ৭৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সনিয়া ও রাহুলের নামে। বাকি ২৪ শতাংশ ছিল কংগ্রেস নেতা মতিলাল ভোরা, অস্কার ফার্নান্দেজ এবং শ্যাম পিত্রদা প্রমুখের নামে বরাদ্দ। প্রথম দু’জন বর্তমানে প্রয়াত। নতুন ওই কোম্পানি অর্থাৎ ইয়ং ইন্ডিয়া ন্যাশনাল হেরাল্ডের ৯০ কোটি টাকা ঋণ মেটানোর বিনিময়ে সংস্থার যাবতীয় সম্পত্তি লিখিয়ে নেয়।
এই বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে দিল্লির আদালতে মামলা করেছিলেন বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। তাঁর অভিযোগ ছিল ইয়ং ইন্ডিয়া কংগ্রেসকে মাত্র ৫০ লাখ টাকা দিয়ে ৯০ কোটি টাকা ঋণ মকুব করিয়ে নিয়েছে। উল্টে ন্যাশনাল হেরাল্ডের বাহাদুর শাহ জাফর মার্গের যে বাড়িটি ইয়ং ইন্ডিয়া নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়েছে সেটির বাজারমূল্য প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা।
স্বামী আদালতে প্রশ্ন তোলেন, কংগ্রেস যদি তাদের মুখপত্রের কাছে প্রাপ্য ৯০ কোটি টাকা মকুব করে দিতে চাইত তবে তারা নিজেরাই একটা প্রস্তাব গ্রহণ করে তা করে দিতে পারত। কেন তারা সে পথে না হেঁটে একটি নতুন কোম্পানি তৈরি করল।
তাঁর আরও প্রশ্ন, হস্তান্তরের সময় সনিয়া গান্ধী ছিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী। কিন্তু রাহুল গান্ধী গুরুত্তপূর্ণ পদে ছিলেন না। কেন সনিয়া ও রাহুলের নামে কোম্পানির ৭৬ শতাংশ শেয়ার বরাদ্দ করা হয়েছিল?
বিজেপি নেতা আদালতে আরও প্রশ্ন তুলেছেন, যে প্রতিষ্ঠানের নামে দু হাজার কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি রয়েছে, তারা কেন, ৯০ কোটি টাকা ঋণ মেটাতে সদ্য তৈরি কোম্পানিকে সমস্ত সম্পত্তি হস্তান্তর করল?
স্বামীর অভিযোগ, এই ভাবে আসলে দলীয় মুখপত্রের বিপুল সম্পত্তি গান্ধী পরিবারের হস্তগত করার চেষ্টা হয়েছে। স্বামীর ২০১২- র মামলার প্রেক্ষিতে দিল্লির আদালত আয়কর দফতরকে প্রথমে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। আয়কর দফতরের রিপোর্টের প্রেক্ষিতে আদালত ইডিকে তদন্তভার দেয়। সেই মামলায় ২০১৫ সালে আদালত সনিয়া ও রাহুলকে স্বশরীরে কোর্টে হাজিরা থেকে মুক্তি দেয়। তদন্তে সনিয়া ও রাহুলকে তলব করে ইডি।
কংগ্রেসের বক্তব্য, ন্যাশনাল হেরাল্ডের ঋণ মুক্তি, সম্পত্তি হস্তান্তর ইত্যাদির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কোনও সম্পর্ক নেই। এটি ছিল অলাভজনক উদ্যোগ। ইয়ং ইন্ডিয়াও ট্রাস্ট হিসাবে কাজ করে। এটির সঙ্গে লাভ লোকসানের কোনও সম্পর্ক নেই। ফলে ৭৬ শতাংশ মালিকানা সনিয়া, রাহুলদের নামে থাকলেও তারা এক পয়সা কোম্পানি থেকে নেননি এবং সম্পত্তিরও তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে মালিক নন।
অন্যদিকে, সুব্রমনিয়ম স্বামীর বক্তব্য, নতুন কোম্পানি তৈরি এবং সনিয়া, রাহুলদের সিংহভাগ মালিকানা দেওয়াটাই রহস্যজনক। সেই কারণেই তিনি ফৌজদারি মামলা ঠুকেছিলেন।