
শেষ আপডেট: 8 February 2025 15:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ধসে পড়ল শিশমহল, মদে ডুবলেন কেজরিওয়াল। শনিবার ভোটগণনার দু-ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় ভোটারদের মনের কথা কী! দুর্নীতি ঝেঁটিয়ে বিদেয় করার যে স্বচ্ছতার ঝাঁটা হাতে দেশের রাজনীতিতে প্রবেশ করে দিল্লির রাজনীতি থেকে কয়েক দশক ধরে বিরাজমান কংগ্রেসকে ধূলিকড়িহীন করে ছেড়েছিলেন কেজরি, সেই দুর্নীতিরই 'মাফলার' গলায় জড়িয়ে এদিন বিধানসভা থেকেই বিদায় নিলেন আন্না হাজারের মানসপুত্র মাফলারম্যান। বিধানসভার বিরোধী দলনেতার তিলকটি পর্যন্ত পরতে চলেছেন তুলনায় নবীন মুখ্যমন্ত্রী আতিশী মারলেনা। কারণ, শুধু অরবিন্দ কেজরিওয়ালই নয়, হেরে গিয়েছেন প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া ও সৌরভ ভরদ্বাজও।
যে বিজেপিকে আম আদমি পার্টি একক সংখ্যায় নামিয়ে নিয়ে এসেছিল, তারা এবার ক্ষমতায় বসার মূলে রয়েছে বেশ কয়েকটি সংযোগ-বিয়োগের অঙ্ক। আর সেই অঙ্ককেই অনেক হিসাব কষে প্রয়োগ করে ভোটে ফায়দা তুলে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহরা। প্রথমত, আম আদমি পার্টি জন্মলগ্ন থেকেই বলে এসেছিল এদেশ থেকে দুর্নীতিকে দূর করবে তারা। সেই হিসেবে তৎকালে কংগ্রেস বিরোধী দলগুলির সুরে সুর মিলিয়ে দেশের প্রাচীনতম দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ তুলেছিলেন কেজরিওয়াল। আম জনতা বা সাধারণ মানুষের কাছে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে একের পর এক খয়রাতি প্রকল্পের ঘোষণা করে গিয়েছেন। তাতে তাঁর ভোটারদের মেয়াদি জমার পরিমাণ বাড়লেও রাজস্ব ভাঁড়ারে হাজার ফুটো তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, ২০১৫ ও ২০২০ সালে আপ দিল্লিতে বিশাল জয় হাসিল করে। বিজেপি তো দূরঅস্ত কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত হাত চিহ্নকে প্রায় মুছে দেয় দিল্লির দেওয়াল থেকে। স্বাস্থ্য, শিক্ষায় ব্যাপক কাজ দেখিয়ে সহজেই জনমনে প্রভাব বিস্তার করে আপ। এছাড়াও বিদ্যুৎ ও জলে ভরতুকির বহরে সাধারণ মানুষ দুহাত ভরে ভোট দিতে থাকে। লোকসভা ভোটে বিপুল জয় পেলেও বারবার বিজেপি দিল্লি বিধানসভায় এসে মুখ থুবড়ে পড়তে থাকে। কিন্তু, ধীরে ধীরে যা হয়, প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থতা, নিকাশির বেহাল দশা, যমুনা দূষণ ও সর্বোপরি রাজধানীর বায়ুদূষণের বিষ মানুষের মনকে বিষাক্ত করে তুলতে থাকে।
কিন্তু, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আম আদমি পার্টির নেতারা কেন্দ্রের বিজেপির ঘাড়ে দোষ চাপালেও তা ফলত মানুষের কাছে সাফাই বলে মনে হতে শুরু করে। আর অন্যদিকে, বিজেপির ক্রমাগত ডাবল ইঞ্জিনের প্রচার ও অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যের সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি দেখে সাধারণ মানুষেরও মন গলে গেল। আর সে কারণেই বিজেপির প্রবল প্রতাপ সত্ত্বেও ঝাড়খণ্ডে হেমন্ত সোরেনের ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা রামরথ ঠেকাতে সমর্থ হলেও ব্যর্থ হলেন কেজরিওয়াল। কারণ ভোট ঘোষণার অনেক আগেই তিনি একতরফা একলা চলো নীতি নিয়ে ফেলায় ইন্ডিয়া জোটের তাৎপর্য হারিয়ে গেল। যা ঝাড়খণ্ডের ক্ষেত্রে হয়নি। বিজেপি বিরোধী ভোট একবাক্সে জমা হয়েছে জেএমএম-কংগ্রেস ও আরজেডি-র জোট কৌশলে।
অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বিষফোঁড়া হয়ে দেখা গেল মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সংস্কার করা। কোভিড কালে যখন দিল্লি কেন দেশজুড়ে সমস্ত নির্মাণকাজ স্তব্ধ তখনও মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ঢেলে সাজার কাজ চলতে থাকায় তা নিয়ে কাঠগড়ায় উঠলেন খোদ কেজরিওয়াল। আর মোদীর কথায়, এই শিশমহল নিয়ে বিজেপির তোপের মুখে পড়ল গোটা দল। যদিও এক নেতাভিত্তিক দলের এটাই সমস্যা। দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির কথাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। প্রায় ৮ কোটি টাকার প্রস্তাবিত খরচের জায়গায় ২০২২ সালে যখন তা সম্পূর্ণ হয়, তখন খরচ দাঁড়ায় ৩৩.৬৬ কোটি টাকায়। এবারেও আপ নেতৃত্ব মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের তুলনা টানতে শুরু করে। কিন্তু এই প্রচারের সাফল্য ঘরে তোলে গেরুয়া পার্টিই।
চলতি আপ সরকারের পতনের সূত্রপাত আবগারি দুর্নীতি মামলা থেকেই চূড়ান্তভাবে লেখা শুরু হয়। যদিও পরে চাপে পড়ে আপ সরকার এই আইন প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু ততদিনে দুর্নীতির জোব্বা গায়ে চড়ে গিয়েছে খোদ মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল, মণীশ সিসোদিয়া ও আরও অন্য নেতৃত্বের গায়ে। যার জেরে দীর্ঘ জেলবাস করতেও হয় নেতাদের। কোটি কোটি টাকার এই দুর্নীতির অভিযোগ ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের বিরুদ্ধেও উঠেছিল। কিন্তু, তার কেলেঙ্কারি দলের শিকড় পর্যন্ত না পৌঁছাতে পারায় জেএমএমের তরী ডুবল না, কিন্তু আপ সেই সুনামিতে ভেসে গেল। শুধু দিল্লি কেন, গোটা দেশের সামনে অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে চোর বলে বিশ্বাস করাতে বাধ্য করল বিজেপির প্রচার। যার ফল হিসেবে যে একহাতে দলকে স্বচ্ছতার হাতিয়ার বলে শান দিয়েছিলেন কেজরিওয়াল, সেই একগুঁয়েমির হাতযশেই আজ আম আদমি পার্টি বহু দূরে সরে গেল আম জনতার কাছ থেকেই।