
যোগী রাজ্যে নিহত গাংস্টারের তালিকার আগের ছয়জনের মৃত্যুও রহস্যে ঘেরা । দ্য ওয়াল ফাইল
শেষ আপডেট: 29 March 2024 12:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুখতার আনসারির মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী। গ্যাংস্টার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা মুখতার একটা সময় মায়াবতীর বিএসপির বিধায়ক ছিলেন। বিধায়ক হয়েছিলেন সমাজবাদী পার্টিরও। মুখতারের ছেলের অভিযোগের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছে সমাজবাদী পার্টিও।
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, দু-দশক ধরে জেলে থাকলেও মুখতারের মৃত্যু লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে। কারণ, পূর্ব উত্তরপ্রদেশের বালিয়া, বারাণসী, গাজিপুর, মৌ এলাকায় গরিব মানুষের উপর মুখতারের বাহিনীর প্রভাব রয়েছে। তাঁর জনপ্রিয়তাতেও ভাটা পড়েনি পুরোপুরি।
মুখতারকে নিয়ে ২০১৭ থেকে এ পর্যন্ত উত্তর প্রদেশে সাতজন প্রথমসারির গ্যাংস্টারের মৃত্যু হল। আর অনেক মৃত্যু ঘিরে বিতর্কে জড়িয়েছে যোগী আদিত্যনাথ সরকার ও তাঁর পুলিশের এনকাউন্টার তত্ত্ব। যোগীর সাত বছরের শাসনে দেড়েশোর বেশি দুষ্কৃতীকে গুলি করে হত্যা করেছে পুলিশ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ মৃত্যুর কারণ হিসাবে সংঘর্ষের কথা বলেছে। পুলিশের দাবি, পুলিশকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে পালানোর সময় সংঘর্ষে মারা যায় ওই দুষ্কৃতীরা।
বিতর্ক গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। আলোচনায় উঠে আসে মুম্বই পুলিশের এনকাউন্টার অভিযানের কথা, যা বলিউড সিনেমাতেও ঝড় তুলেছিল। মুম্বই পুলিশের শার্প স্যুটার এক ইন্সপ্রেক্টর দয়া নায়েকের দুষ্কৃতী হত্যার কাহিনি অবলম্বনে রাম গোপাল ভার্মা তৈরি করেছিলেন ‘অব তক্ ছাপ্পান’ সিনেমাটি। ২০০৪ সালে রিলিজ হওয়া সিনেমাটি নিয়ে দেশবাসী যখন একদিকে মাফিয়ারাজ, অন্যদিকে পুলিশের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে সরব তখনই গ্রেফতার হয় মুখতার আনসারি।
দুষ্কৃতী দমন অভিযানে উত্তরপ্রদেশ পুলিশে অবশ্য দয়া নায়েকের মতো কোনও অফিসারের নাম সামনে আসেনি। তবে দেড়শোর বেশি দুষ্কৃতীর সংঘর্ষে নিহত হওয়ার তত্ত্ব নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলি বারে বারে সরব হয়েছে।
যদিও পুলিশের এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যোগী সরকারের ঘোষিত নীতির কোনও বিরোধ নেই। ২০১৭-তে মুখ্যমন্ত্রী চেয়ারে বসে যোগী সবচেয়ে বেশি জোর দেন দুষ্কৃতী দমন অভিযানেই। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, দু বছর আগের বিধানসভা ভোটে যোগী সরকারের ক্ষমতায় টিকে যাওয়ার পিছনে দুষ্কৃতী দমন বড় ভূমিকা নেয়।
শুধু হত্যাই নয়, রাজ্যের গ্যাংস্টার অ্যান্ড অ্যান্টি সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্টে মাফিয়া, দুষ্কৃতীদের কোটি কোটি টাকার জমি-বাড়ি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে যোগী সরকার। সরকারের দখলে আসা জমি-বাড়িতে এখন সরকারি প্রকল্প তৈরি হচ্ছে।
আবার নিহতের তালিকায় তুলনামূলকভাবে সংখ্যালঘু দুষ্কৃতীর সংখ্যা বেশি দাবি করে বিরোধীদের অনেকেই বলার চেষ্টা করেন, অপরাধ দমনেও বিভাজন রাজনীতিকে পাথেয় করে চলছে উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার।
যদিও দুষ্কৃতী হত্যার ঘটনায় বড় ধরনের বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল চার বছর আগে কানপুরে বিকাশ দুবে নামে এক মাফিয়ার পুলিশের হাতে মৃত্যু ঘিরে। কানপুর ও আশপাশের এলাকার গ্যাংস্টার হিসাবে নামডাক থাকলেও একটি ঘটনায় বিকাশ গোটা দেশে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে। ২০২০-এর জুলাইয়ে কানপুরে তাঁর গ্রামের বাড়িতে পুলিশ গেলে বিকাশের দলবল আট পুলিশ কর্মীকে হত্যা করে।
সেই ঘটনার পর পলিশের হাত থেকে বাঁচতে বিকাশ পালিয়ে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে উজ্জয়নের মহাকাল মন্দিরে এক সকালে পুজো দিতে গেলে ফুলমালার ডালা বিক্রেতা তাকে চিনে ফেলে। সেই ব্যক্তি স্থানীয় পুলিশকে খবর দিলে মন্দির এলাকা থেকেই তাকে গ্রেফতার করে মধ্যপ্রদেশ পুলিশ। উত্তরপ্রদেশ পুলিশ সেখান থেকে তাকে কানপুরে নিয়ে আসার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় ওই দুষ্কৃতীর।
পুলিশ দাবি করে কানপুরে ঢোকার পর পুলিশের জিপ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সংঘর্ষে মৃত্যু হয় পুলিশের। সেই মৃত্যু আসলে ঠাণ্ডা মাথায় পুলিশের হত্যাকাণ্ড বলে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন বিকাশের স্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধেও পুলিশের খাতায় গুচ্ছ মামলা আছে।
মুখতার আনসারির গ্যাংয়ের অন্যতম সদস্য ছিল সঞ্জীব জীবা। যদিও তার এলাকা ছিল পশ্চিম উত্তর প্রদেশের মেরঠ এলাকা। একাধিক মামলায় জেল বন্দি সঞ্জীবের মৃত্যু ঘিরে এখনও বিতর্ক চলছে। সত্তর-আশির দশকে হিন্দি সিনেমায় যে দৃশ্য হামেশাই দেখা যেত গত বছর তেমনই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন লখনউ আদালত চত্বরে উপস্থিত বহু মানুষ। আদালতে পেশ করার পর প্রিজন ভ্যানে তোলার মুখে অজ্ঞাত পরিচিত দুষ্কৃতীরা একে-৪৭ থেকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে তাকে। আহত হন এক পুলিশকর্মীও। মনে করা হচ্ছে, প্রতিপক্ষ শিবির হত্যা করে সঞ্জীবকে। যদিও আসল কারণ এখনও অজানা। এই ঘটনা গত বছরের।
এখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। উত্তর প্রদেশে মাফিয়া, গ্যাংস্টার, দুষ্কৃতীদের জীবন নিরাপদ নয় হাসপাতালেও। এমনকী পুলিশি ঘেরাটোপে থাকা অবস্থাতেও না। সাবেক এলাহাবাদ, অধুনা প্রয়াগরাজের হাসপাতাল চত্বরে গত বছর ১৫ এপ্রিল মাফিয়া ডন আতিক আহমেদ ও তাঁর ভাই আশফাক আহমেদকে তিন দুষ্কৃতী পুলিশের সামনে গুলি করে হত্যা করে। দুই মাফিয়া ভাইকে পুলিশ স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনার দু’দিন আগে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় আতিকের বাইশ বছর বয়সি পুত্র।
অন্যদিকে, আর এক বাহুবলী মুন্না বজরংঙ্গী নিহত হয় জেলের ভিতর। বাগপত জেলে বন্দি মুন্নাও ছিল মুখতার আনসারির দলের সদস্য। তার দখলে ছিল বারাণসী। সেখানে তার তোলাবাজিতে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল ব্যবসায়ীরা। তোলা দিতে অস্বীকার করায় এক ব্যবসায়ীকে খুনের অভিযোগে ধৃত মুন্নাকে জেলের মধ্যেই প্রতিপক্ষ গ্যাংস্টাররা গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনা ২০১৮-র জুলাইয়ের।
অন্যদিকে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় অনিল দুজানা, উদয়ভান যাদব নামে দুই মাফিয়া। সংঘর্ষে মৃত্যুর প্রায় সব ক’টি ঘটনাতেই পুলিশের বিরুদ্ধে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার অভিযোগ ওঠে।