.webp)
রাহুল ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধী।
শেষ আপডেট: 13 June 2024 12:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অষ্টাদশ লোকসভা অধিবেশন শুরুর ঠিক মুখেও ভোটের ফল নিয়ে ময়নাতদন্তের বিরাম নেই। যুক্তি-তর্ক, পাটিগণিত, সংখ্যাতত্ত্ব সবকিছু নিয়ে যখন চুলচেরা বিচার চলছে, তখন একটা সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, 'কংগ্রেস মরিয়াও প্রমাণ করিল মরে নাই।' নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের 'বডিলাইন' সিরিজের বোলিং লাইনআপেও মাথা কাটা যায়নি কংগ্রেস টিমের ব্র্যাডম্যান রাহুল গান্ধী ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর।
প্রায় আড়াই দশক ধরে দেশের প্রাচীনতম দলটি সম্পর্কে বিজেপি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও 'অরণ্যের প্রবাদের' মতো যে বিশ্বাস পাথর হয়ে বুকের মধ্যে চেপেছিল, তা ২০২৪ সালের ভোটে ভেঙে দিতে পেরেছেন রাহুল-প্রিয়ঙ্কা জুটি। কংগ্রেস পারবে না, কংগ্রেসের ক্ষমতা নেই, কংগ্রেস হারিয়ে গিয়েছে, কংগ্রেস শেষ- এই বদ্ধমূল সংস্কারের জগদ্দলকে নামিয়ে দিতে পেরেছে রাহুল-প্রিয়ঙ্কা-মল্লিকার্জুন খাড়্গের টিম।
এর আগের লোকসভা ভোটগুলিতে কংগ্রেস কখনও পেয়েছে ৪৪, কখনও ৫২, সবথেকে করুণ দশা হয়েছে ৩২টি আসন পেয়ে। তাও কেরল, পাঞ্জাব এবং তামিলনাড়ু থেকে জিতে। যেখানে বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদী শক্তির অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু, এবার বিজেপির ৪০০ পারের গোয়েবলস-তত্ত্বকে (হিটলারের প্রচারমন্ত্রী) মিথ্যা প্রমাণ করে তাদের ২৪০-এ ঠেকিয়ে রাখতে কংগ্রেসের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র মোদী-বিজেপি বিরোধী ইন্ডিয়া জোটকে একছাতার তলায় ধরে রাখাই নয়, সংসদে বিরোধীদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছে।
এবারের ভোটে কংগ্রেস সর্বতোভাবে লাভবান হয়েছে। হিন্দি বলয় বা বলা ভালো বিজেপির গোবলয়ে অর্থাৎ হরিয়ানা থেকে বিহার পর্যন্ত তলানিতে ঠেকে যাওয়া ৫টি এমপি থেকে ২৩টি আসনে জিতেছে তারা। মহারাষ্ট্রে সরকার হারানোর পরেও দারুণ ফল, পাঞ্জাবে বিজেপিকে খাতা খুলতেই দেয়নি। উত্তর-পূর্বের মণিপুর নিয়ে লাগাতার মোদী বিরোধী রাহুল গান্ধীর প্রচার ও সমালোচনার সুফল ঘরে তুলেছে ২টি আসনেই জিতে। নাগাল্যান্ড, মেঘালয়ে পা রেখেছে।
শুধু আসন সংখ্যাই নয়, ভোটের গোপন সত্য নিহিত থাকে প্রাপ্ত ভোটের হারে। সর্বভারতীয় দৃষ্টিতে দেখলে কংগ্রেসের মাত্র ১.৭ শতাংশ ভোটবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু, মনে রাখতে জোটধর্ম বজায় রাখতে কংগ্রেস এবার ৯৩টি কম আসনে লড়েছে। ফলে যে আসনগুলিতে লড়াই করেছে, সেখানকার ভোটের হার দেখলে দেখা যাবে ২০১৯ সালের তুলনায় ৯.৮ শতাংশ ভোট বেড়েছে হাত চিহ্নের। এর সঙ্গে তুলনায় বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কেন্দ্রে ভোট কমেছে ১.৬ শতাংশ পয়েন্ট।
কেরল, ওড়িশা এবং পাঞ্জাব বাদ দিলে কংগ্রেস প্রায় সব রাজ্যেই ভোট শতাংশের হার বাড়িয়েছে। এর পিছনে যে কারণগুলি রয়েছে তা হল, রাহুল গান্ধীর দুই পর্বে 'অরাজনৈতিক' ভারত জোড়ো যাত্রার অভূতপূর্ব সাফল্য। দ্বিতীয়ত, বিজেপির চড়া সুরে হিন্দুত্ববাদের বিরোধিতা করে যাওয়া, কৃষকদের সমর্থনে, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন আন্দোলন। মণিপুরে অশান্তির কারণে সোজাসুজি মোদীকে কাঠগড়ায় তোলাসহ সংসদে হিন্ডেনবার্গ-আদানি কাণ্ড নিয়ে শোরগোল। তৃতীয়ত, রাহুল গান্ধীকে বরখাস্ত এবং বাংলোচ্যুত করা, আদালতের নির্দেশে সাংসদ পদে পুনর্বহাল- এরকম অসংখ্য শামুকে পা কাটার মতো ভুল পদক্ষেপ করেছেন মোদী-শাহ জুটি।
কংগ্রেস একের পর এক নির্বাচনে হারতে হারতে তৃতীয় সারিতে চলে গিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে নিজেদের উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে তারা। ২০১৯ সালে হিন্দিবলয়ে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া কংগ্রেস আর কোনওদিন বিজেপির চোখে চোখ রেখে লড়াই করার ক্ষমতা হারিয়েছে। এই প্রবাদও মিথ্যা করে দিয়েছে তারা। উত্তরপ্রদেশ বিধানসভায় কংগ্রেসের ভরাডুবির পর থেকে এটা যেন ধ্রুবসত্যে পরিণত হয়েছিল। এবার তার মধ্যে ৬২টি কেন্দ্রে জিতেছে রাহুলের দল। শুধু তাই নয়, বিজেপির জয়ের ব্যবধানের অঙ্ককে অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে।
একটা সময় এসে গিয়েছিল যখন আঞ্চলিক শরিক দলগুলি কংগ্রেসকে বোঝা বলে মনে করতে শুরু করেছিল। এবার কংগ্রেস তাকেও মিথ্যা প্রমাণ করেছে। শুধু তামিলনাড়ু এবং মহারাষ্ট্র নয়, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, দিল্লি এবং জম্মু-কাশ্মীরেও। শুধু ব্যর্থ হয়েছে ঝাড়খণ্ডে।
কংগ্রেসের পিতৃভূমি উত্তরপ্রদেশ। সেখানেই কংগ্রেসের ভোট শেয়ার চলে গিয়েছিল ২ শতাংশে। কিন্তু, এবার মিরাক্যল ঘটিয়ে দিয়েছে দেশের সরকার গড়ার রাজ্যে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত সাফল্যের মধ্যেও কংগ্রেসের অভ্যন্তরে এখনও ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়ে গিয়েছে। যা সংশোধন করতে হবে দলকে। তেলঙ্গানা, ওড়িশা, কর্নাটক, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড়, উত্তরাখণ্ডে ভুল খুঁজে বের করতে হবে। এমনকী পশ্চিমবঙ্গেও কংগ্রেসের ভোট কৌশলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব লক্ষ্য করা গিয়েছে। শরিক বাছাইয়ে দুর্বলতাও এর একটা কারণ। যার ফলে প্রায় হেসেখেলে ৬টি আসন বিজেপির হাতে তুলে দিয়েছে তারা। ১৫ বছর দিল্লিতে রাজ চালানোর পরেও দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।
এই দীর্ঘ নির্বাচনী খেলা একটি বা দুটি ইনিংসেই শেষ হয় না। খারাপ পিচে দাঁড়িয়ে বডিলাইন বোলারদের মুখোমুখি হয়ে, সেটিং করা আম্পায়ারদের সিদ্ধান্তকে মেনে, প্রতিকূল সংবাদ প্রচারের আবহাওয়ায় ৯৯ নটআউট এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খুব একটা খারাপ রান নয়।