
কর্নেল মনপ্রীত সিং।
শেষ আপডেট: 18 June 2024 10:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রায় একবছর আগে কফিনে বন্দি বাবাকে দেখেছিল ছেলে। তবে বোঝেনি, এর অর্থ কী। বোঝেনি, কফিনে বন্দি হওয়ার পরে কখনওই মানুষ মুক্তি পায় না। সেই কারণেই ছ'বছরের ছেলে আজও অপেক্ষা করে বসে আছে, কখন বাবা বাড়ি আসবে। এখনও সে বাবার ফোন নম্বরে বারবার মেসেজ পাঠায়, 'একবার বাড়ি চলে এসো না, প্লিজ!'
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগে জঙ্গিদের সঙ্গে তুমুল গুলি যুদ্ধে প্রাণ হারান কর্নেল মনপ্রীত সিং। ৪১ বছর বয়সি মনপ্রীতের সঙ্গে শহিদ হন আরও দুই অফিসার। কিন্তু তাঁর ছোট্ট ছেলে কবিরের কাছে বাবা এখনও জীবিত, সে বিশ্বাস করে, বাবা নিশ্চয় বাড়ি ফিরবে।
শুধু ছেলে কবির কেন, মনপ্রীতের স্ত্রী জগনীতেরও তো এখনও মন মানে না। প্রতি মুহূর্তে স্বামীর সুন্দর স্মৃতিরা ভিড় করে থাকে তাঁর মাথায়। সেই সুন্দর স্মৃতিদের ভিড়ের মাঝে কোথাও মৃত্যু নেই, কান্না নেই। মাঝেমাঝে কেবল মনে পড়ে যায়, শেষ ফোনকলের কথা। মাত্র ৩২ সেকেন্ডের ফোনকল। এখনও মনে আছে সবক'টা কথা। রাখার আগে মনপ্রীত বলেছিলেন, 'অপারেশন মে হুঁ।'
জগনীত সেদিন দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, এটাই তাঁর স্বামীর জীবনের শেষ অপারেশন। ভাবেননি, আর কোনও দিন কথা বলার সুযোগ হবে না স্বামীর সঙ্গে।
জগনীত জানান, কাশ্মীরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন মনপ্রীত। এমনকি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও তিনি ছিলেন মুশকিল আসান। তাঁরা এখনও কর্নেল সিংকে মনে রেখেছেন। কর্নেলের ভদ্র ব্যবহার, বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া, সকলকে সাহায্য করা-- এসবই লোকের মুখে মুখে ফেরে।
সব সময় সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিতে ভালবাসতেন মনপ্রীত। বলতেন, আমার যাই হোক না কেন, আমার লোকজন যেন সুরক্ষিত থাকে। ভালবাসতেন খেলাধুলো, চাইতেন অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরা আরও বেশি করে খেলাধুলোর সঙ্গে যুক্ত হোক। এলাকার বহু মাদকাসক্ত কিশোর-যুবককে রিহ্যাবেও পাঠিয়েছিলেন তিনি। সুস্থ, নীরোগ জীবন যাপনের উপর সব সময় জোর দিতেন তিনি।
২০১৬ সালে সন্ত্রাসী বুরহান ওয়ানিকে খতম করে নিজের কেরিয়ারেও নজির করেছিলেন মনপ্রীত। ২০০৩ সালে সেনা বাহিনীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন তিনি। এরপর ২০০৫ সালে কর্নেল পদে উন্নীত হন। দেশের শত্রুদের খতম করতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনেক অপারেশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
কর্নেল মনপ্রীত সিং ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড হ্যান্ড কমান্ড হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। পরে তিনি কমান্ডিং অফিসার হিসেবে কাজ করেন। এর পরে আর্মি অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত হন কর্নেল মনপ্রীত। 'পিস পোস্টিং' হিসেবে অন্যত্র শান্তিপূর্ণ একটি জায়গায় বদলির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। সেদিন চটজলদি জবাব দিয়েছিলেন, বদলির দরকার নেই তাঁর। অথচ, সেদিন যদি সামান্য ভেবে 'না' এর বদলে 'হ্যাঁ' বলতেন, তাহলে আজ হয়তো কর্নেল মনপ্রীত সিংয়ের নামের সঙ্গে চিরতরে 'শহিদ' শব্দটা জুড়ে যেত না।
এ শব্দের ভার অবশ্য ছোট্ট কবির এখনও বোঝেনি। তাই বারবার বাড়ি ফেরার অনুরোধ জানিয়ে বাবাকে ফোনে ভয়েস মেসেজ পাঠায় সে। 'পাপা বাস একবার আ যাও, ফির মিশন পে চলে জানা।’ কচিগলায় পাঠানো সেই মেসেজে যে কতটা যন্ত্রণা জমে, তা বোধহয় সে নিজেও জানে না। তাই তো মায়ের কাছে তার বায়না, বাবাকে ভিডিও কল করে শুধু একটিবার দেখবে সে। দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে শহিদ হয়েছেন তার বাবা-- এত ভারী সত্য এখনও যে স্পর্শ করতে পারেনি বাবার প্রতি তার টানকে!