
শেষ আপডেট: 29 April 2025 17:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাল্টাচ্ছে বর্ষাকালের সময়। বদলাচ্ছে আবহাওয়া। বঙ্গোপসাগরে ধীরে ধীরে ভ্যানিশ হতে চলেছে মাছ! এক সমীক্ষায় উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইলিশ বা আপনার পছন্দের মাছ আগামিদিনে খেতে পারবেন তো? সেনিয়েই বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
ঠিক কী সমস্যা হচ্ছে? কেন কমতে চলেছে মাছের জোগান?
নেচার জিওসায়েন্সে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, বিশ্বে যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে এরাজ্যে গরম কাল ও বর্ষাকাল বিপর্যস্ত হতে চলেছে। ঠিক এর ফলেই হুমকির মুখে জলজ বিভিন্ন প্রাণি। যাতে মাছও রয়েছে।
গবেষকরা গত ২২ হাজার বছরের মৌসুমি এবং মহাসাগর সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, অতিবৃষ্টি বা খরার সময় বঙ্গোপসাগরের উপরিভাগে খাদ্য সরবরাহ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই প্রবণতা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে আশঙ্কা করেন তাঁরা।
গবেষণা বলছে, বিশ্বে যতভাগ জল আছে, তার ১ শতাংশেরও কম অংশজুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর কিন্তু এটি বিশ্বের আট শতাংশ মাছের উৎস। ইলিশের মতো সুস্বাদু মাছও এই সাগরেই জন্মায়।
গবেষণায় ঠিক কী দেখা গেছে?
বিজ্ঞানীরা ফরামিনিফেরা নামের এক ধরণের অণুজীব প্ল্যাঙ্কটনের জীবাশ্ম খোলস জোগার করেন। এই খোলসগুলিতে প্রাচীন পরিবেশগত পরিস্থিতির রেকর্ড থাকে। এভাবে তাঁরা ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মৌসুমি বৃষ্টিপাত, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক উৎপাদনে কী প্রভাব ফেলেছে, তা পরীক্ষা করে দেখেন। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য উল্লেখ করেন গবেষণাপত্রে।
দেখা যায়, অতিরিক্ত কম অথবা অত্যন্ত বেশি মৌসুমি বৃষ্টিপাত, উভয়ই সমুদ্রের জলের স্তরকে মিশতে বাধা দেয়, ফলে গভীর জল থেকে উপরের স্তরে পুষ্টি সরবরাহ হয় না। এতে প্ল্যাঙ্কটনের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটে এবং সামুদ্রিক খাদ্য চক্র বিপর্যস্ত হয়।
উদাহরণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৭ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার ৫০০ বছর আগে হাইনরিখ স্টাডিয়াল ১ (Heinrich Stadial 1)-এর সময়কালে মৌসুমি বাতাসের শক্তি কম থাকায় পুষ্টি উপাদান উপরে ওঠেনি। অপরদিকে, প্রায় ১০ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ বছর আগে প্রাক-হোলোসিন কালে অতিবৃষ্টির ফলেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই ক্ষেত্রেই সামুদ্রিক উৎপাদন একেবারে ভেঙে পড়ে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এমন ঘটনা আগামিদিনে আবারও হতে পারে।
প্রায় ১৫ কোটি মানুষ বঙ্গোপসাগরের মাছের উপর নির্ভরশীল। গবেষণার এক লেখক এবং জলবায়ু বিজ্ঞানী ইয়ায়ার রোসেনথাল বলেন, 'সমুদ্রের প্ল্যাঙ্কটন উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেলে, সামগ্রিক মাছের মজুদ কমবে।' অবস্থা আরও জটিল হতে পারে বাংলাদেশ-সহ উপকূলবর্তী অঞ্চলের কারিগরি মৎস্যশিল্প, যা এই অঞ্চলের মোট সামুদ্রিক মাছের ৮০ শতাংশের জোগান দেয়।
সাগর-মহাসাগর সংক্রান্ত আধুনিক কিছু তথ্য ও জলবায়ু মডেলও এই বিপর্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণার আসল লেখক কৌস্তভ থিরুমালাইয়ের মতে, ইলিশ মাছের সংখ্যা বারবার এই বিপর্যয়ের ফলে তলানিতে চলে যেতে পারে, এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি এলাকার মানুষজন অপুষ্টিতে পর্যন্ত ভুগতে পারেন।
আর যাই হোক, গবেষণার ফলে অন্তত এটা পরিষ্কার হয়েছে, জলবায়ু সংক্রান্ত মডেল আরও উন্নত করা এবং টেকসই কোনও নীতি কার্যকর করা এখন অত্যন্ত জরুরি। ইয়ায়ার রোসেনথাল বলেন, 'এই তথ্যগুলিকে কাজে লাগিয়ে উপকূলীয় সম্পদ রক্ষা করার পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত, কারণ জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।'